রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধান এবং তাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি নতুন করে আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। বুধবার (১৯ নভেম্বর) গৃহীত এই প্রস্তাবে দমন-পীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অব্যাহত মানবিক সংকটে উদ্বেগ জানানো হয় এবং রোহিঙ্গাদের জন্য টেকসই সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়।
অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) যৌথভাবে প্রস্তাবটি উত্থাপন করে। জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশ মিশন জানায়, মোট ১০৫টি দেশ প্রস্তাবটির সহউত্থাপক হিসেবে যুক্ত হয়েছে, যা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বৈশ্বিক ঐক্যের বার্তা বহন করে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গণহত্যার মতো সামরিক অভিযানের পর থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গা ইস্যুটি বারবার আলোচনায় এলেও বাস্তব অগ্রগতি তেমন দেখা যায়নি; প্রতি বছরের মতো এবারও প্রস্তাবটি গৃহীত হলো, তবে সংকট আরও গভীর হয়েছে।
প্রস্তাবে রাখাইনে মানবাধিকার লঙ্ঘন, মানবিক সহায়তা প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ এবং বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চাপ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ‘নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন’ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি শক্তিশালী ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়।
প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পরে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে চলমান স্থবিরতায় হতাশা প্রকাশ করে। প্রতিনিধি দল জানায়, আট বছর ধরে বিভিন্ন মহলের আশ্বাস পাওয়া গেলেও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে কোনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। ফলে একটি দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল স্পষ্টভাবে জানায়, দেশ আর ১৩ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার অতিরিক্ত বোঝা বহন করতে পারছে না। সীমিত সম্পদ, সামাজিক চাপ, পরিবেশগত ক্ষতি এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে দ্রুত সমাধান অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তাই তারা আন্তর্জাতিক মহলকে অবিলম্বে কার্যকর কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানায়, যাতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়া যায়।
রোহিঙ্গা ইস্যুটি এখন শুধু মানবাধিকার নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের এই সর্বসম্মত প্রস্তাব সংকট সমাধানে নতুন গতি যোগ করবে বলে আশা করা হলেও, বাস্তব অগ্রগতি নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সুসংহত ভূমিকা, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সহায়তার ওপর।
এখন বিশ্বের চোখ—নির্যাতনের শিকার ১৩ লাখ মানুষের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন কি এবার বাস্তব অগ্রগতির মুখ দেখবে, না কি প্রস্তাবই হয়ে থাকবে কাগজে-কলমে!