শিরোনাম :
টেকসই প্রবৃদ্ধিতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় সহযোগিতার নতুন দিকনির্দেশনা ২৮তম শাংহাই চলচ্চিত্র উৎসবের পর্দা নামল রেলওয়ের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন, পাঁচ বছরে ২৪ লাখ গাছ লাগানোর লক্ষ্য পেনাল্টি মিসের হতাশা ভুলে ইতিহাস গড়লেন মেসি, অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে নকআউটে আর্জেন্টিনা জুলাই অভ্যুত্থান ঘিরে অভিযোগ: ঢাবির তিন শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত, আরও দুজনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিশ্ব সঙ্গীত দিবসে সুরের মিলনমেলা, দুই দিনের আয়োজন শেষ করল সঙ্গীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদ ফ্রান্সে রেকর্ড দাবদাহে দুই দিনে প্রাণ গেল ১৮ জনের নতুন এল নিনোর প্রভাবে বিপর্যয়ের আশঙ্কা, উষ্ণ হতে পারে ২০২৭ সাল সাড়ে তিন মাস পর হরমুজ প্রণালি পেরোল ‘বাংলার জয়যাত্রা’ বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয় জয়, নকআউট নিশ্চিত করল নরওয়ে

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চুকনগর গণহত্যার ৫৪ বছর

আশীষ কুমার দে, জার্মান বাংলা চ্যানেল, ঢাকা অফিস
  • প্রকাশের সময়: সোমবার, ১৯ মে, ২০২৫
চুকনগর গণহত্যার শিকার অগণিত শহীদের স্মরণে নির্মি ত স্মৃতিসৌধ

কোনো দেশে পৈশাচিক গণহত্যার তথ্য প্রকাশিত হলেই আমরা তার সঙ্গে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের তুলনা করে থাকি।

অনেকের মুখে মুখে জালিয়ানওয়ালাবাগের উদাহরণ উচ্চারিত হলেও ওই ঘটনার ৫২ বছর পর বাংলাদেশেই ঘটেছে এর চেয়ে বহুগুণ বিভৎস হত্যাযজ্ঞ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ‘চুকনগর গণহত্যা’ নামে স্বীকৃত সেই রোমহর্ষক কাহিনী আমরাই ভুলতে বসেছি। আগামীকাল ২০ মে সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ৫৪ বছর।

তবে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড নি:সন্দেহে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম জঘন্য গণহত্যা। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের অমৃতসর শহরে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেগিনাল্ড ডায়ারের নির্দেশে শহরের জালিয়ানওয়ালাবাগ নামক একটি বদ্ধ উদ্যানে সমবেত নিরস্ত্র জনগণের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে শিশু, নারী ও বৃদ্ধসহ সহস্রাধিক মানুষকে হত্যা করেছিল ব্রিটিশ সেনারা।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দমিয়ে রাখতেই চালানো হয়েছিল ওই গণহত্যা।

এর প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর দেয়া ‘নাইটহুড’ উপাধি পরিত্যাগ করেন।

সেই থেকে ঘটনাটি ‘জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড’ নামে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে।

এই সেই অভিশপ্ত ভদ্রা নদী

এবার আসছি চুকনগর গণহত্যা বিষয়ে। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রায় দুই মাসের মাথায় ১৯৭১ এর ২০ মে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের চুকনগরে পাকিস্তানি হানাদারেরা চালিয়েছিল পৈশাচিক গণহত্যা। কয়েক ঘন্টার বেপরোয়া গুলিবর্ষণে সেদিন কতো মানুষ নিহত হয়েছিলেন তার প্রকৃত তথ্য আজো অজানা।

তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এ ঘটনায় প্রায় ১২ হাজার মানুষ প্রাণহানি ঘটেছিল। ইতিহাসের জঘন্যতম এই নৃশংসতার ৫১ বছরে নিহত সকলের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

সংক্ষিপ্ত বর্ণনা
একাত্তরের এপ্রিল ও মে মাসে দক্ষিণাঞ্চলে হিন্দুদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন ও গণহত্যা চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। হানাদারদের নৃশংসতা ও অত্যাচারের মুখে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা খুলনা, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর, বরিশাল ও ঝালকাঠির বিভিন্ন এলাকার বিপুলসংখ্যক হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ লাখ লাখ মানুষের একটাই উদ্দেশ্য ছিল- খুলনার ডুমুরিয়া হয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে পৌঁছে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়া। ভারতীয় সীমান্ত পৌঁছাতে হলে ভদ্রা নদী দিয়ে নৌকায় ডুমুরিয়া পর্যন্ত আসা অপেক্ষাকৃত সহজ ছিলো। এরপর সাতক্ষীরা হয়ে ভারতীয় সীমান্ত পাড়ি। কারণ, নৌপথে যাতায়াতের যেমন সুবিধা, তেমনি ওই পথে হানাদার বাহিনীর আনাগোনা ছিল না বললেই চলে।

তাই দক্ষিণাঞ্চলের নানা প্রান্ত থেকে ভারতের যাওয়ার উদ্দেশে আসা মানুষের ঢল তখন চুকনগর হয়ে সাতক্ষীরা ও যশোর সীমান্তমুখী। এ কারণে চুকনগর বাজারও তখন বেশ পরিচিত।

বাজারটি তিন দিক থেকে নদীবেস্টিত। ভদ্রা নদী দিয়ে নৌকায় আসা মানুষের একমাত্র বিশ্রামস্থল এই বাজার। এরপরই সীমান্তমুখি বিরামহীন পথচলা।

এসব সুবিধার কারণে চুকনগরে ধীরে ধীরে ভিড় বাড়তে লাগলো; যা ১৮ ও ১৯ মে জনস্রোতে রূপ নিলো। মানুষ আসছে, খানিক বিশ্রাম নিয়ে কিংবা রাত কাটিয়ে চলে যাচ্ছে সীমান্তের দিকে। পাকিস্তানি হানাদারদের এখানে চিহ্নমাত্রও নেই। ওরা তখন জানে না, এখানে এতো মানুষের ঢল নেমেছে।

গণহত্যার প্রেক্ষাপট
তখন আটলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন গোলাম হোসেন। আর শামসুদ্দিন খাঁ নামের এক অবাঙালি (বিহারী) ছিলেন ভদ্রা নদীর খেয়াঘাটের ইজারাদার। তারা শান্তি বাহিনীরও সদস্য ছিলেন। চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন ও খেয়াঘাটের ইজারাদার শামসুদ্দিন খাঁ- দু’জনে ১৯ মে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাতক্ষীরা ক্যাম্পে যোগাযোগ করে চুকনগর বাজারের পরিস্থিতি জানালেন। বললেন, সেখানে হিন্দুদের ঢল নেমেছে।

সেদিন (১৯ মে) চুকনগরে একত্রিত হয়েছিল বিভিন্ন স্থান থেকে আসা অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। তাঁরা চুকনগরের পাতখোলা বিল, চুকনগরের কাঁচাবাজার, মাছবাজার, কাপুড়িয়া পট্টি, গরুহাটা, বাজারের কালী মন্দির, বটতলাসহ বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নিয়েছিলেন। তখনও নানা প্রান্ত থেকে অগণিত মানুষ আসছিলেন। তাদের সবার একটাই উদ্দেশ্য- কোনোভাবে রাতটা কাটিয়ে পরেরদিন সীমান্তের উদ্দেশে যাত্রা। কিন্তু চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন ও বিহারী শামসুদ্দিন খাঁর কাছে খবর পেয়ে পাকহানাদারেরা পরেরদিন হত্যাযজ্ঞ চালানোর প্রস্তুতি নেয়।

গণহত্যা যেভাবে চালানো হয়
২০ মে, ১৯৭১। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। আগের দিনও সারারাত হাজার হাজার মানুষ পায়ে হেঁটে, নৌকায়, গরুর গাড়ি করে চুকনগরে এসেছে। ভোর হতেই চারপাশ জেগে উঠলো। মানুষের স্রোত তখন সাতক্ষীরা ও যশোরের ভারতীয় সীমান্ত অভিমুখে। পায়ে হেঁটে সীমান্তের দিকে যাচ্ছেন মানুষ, কেউ মালপত্র গোছাচ্ছেন, কেউ রান্না চাপিয়েছেন। কারো রান্না হয়ে গেছে, অনেকে রওনা দিয়ে দিয়েছেন, অনেকে খেতে বসেছেন।

বেলা সাড়ে ১১টা। এমন সময় সাতক্ষীরা থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি ট্রাক ও একটি জিপ চুকনগর-সাতক্ষীরা সড়ক ধরে চুকনগরের মালতিয়া মোড়ের ঝাউতলায় এসে থামলো। মালতিয়া গ্রামের কৃষক চিকন আলী মোড়ল তখন রাস্তার পাশে পাটক্ষেতে কাজ করছিলেন। গাড়ির শব্দে তিনি উঠে দাঁড়ালে হানাদাররা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করতে গেলে তিনি হাতের কাস্তে ছুঁড়ে মারেন তাদের দিকে। আর সঙ্গে সঙ্গেই পাকবাহিনীর ব্রাশফায়ার। সেখানেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। এ সময় গুলি চালিয়ে একই গ্রামের সুরেন্দ্রনাথ কুণ্ডুকেও হত্যা করে তারা।

এরপর পাকহানাদাররা পাতখোলা বাজারে ঢুকে গণহারে নিরীহ মানুষদের লাইনে দাঁড়িয়ে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। তারা বিভক্ত হয়ে একদল পাতখোলা বিল থেকে চাঁদনী, ফুটবল মাঠ, চুকনগর স্কুল, মালতিয়া, রায়পাড়া, দাসপাড়া, তাঁতিপাড়া এলাকা এবং আরেক দল ভদ্রা ও ঘ্যাংরাইল নদীর পাড়ে জড়ো হওয়া মানুষের ওপর গুলি চালাতে শুরু করে। চুকনগরের আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে অস্ফুট আর্তনাদ, মৃত্যুযন্ত্রণা। প্রাণ বাঁচাতে মানুষের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও হালকা মেশিনগানের অবিরাম গুলিতে ধ্বংসলীলা নেমে এসেছিলো এই জনপদের বুকে। ভদ্রা নদীর জল সেদিন রঞ্জিত হয়েছিল মানুষের লাল তরতাজা রক্তে। অগণিত লাশের কারণে ভদ্রার অনেক স্থানে নৌপথ আটকে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যারা সাঁতরে নদীর অপর পারে গিয়েছিলেন, সেদিন তারাই শুধু বাঁচতে পেরেছিলেন।

বেলা সাড়ে ১১টায় শুরু হওয়া পাকহানাদার বাহিনীর এই গণহত্যা থামে বিকেল ৩টায়; যখন তাদের গুলি ফুরিয়ে যায়। চুকনগর বাজার ও আশেপাশের চার মাইল এলাকাজুড়ে চলা নিষ্ঠুরতম এই গণহত্যায় নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আজও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি; আর কোনোদিন হবেও না। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সেদিন প্রায় ১২ হাজারের মতো মানুষ প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন।

শহীদদের প্রকৃত সংখ্যা না পাওয়ার কারণ
এই গণহত্যায় প্রকৃত শহীদের সংখ্যা না পাওয়ার কারণ হলো- নদীর পানিতে প্রথমে অজস্র লাশ ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল। অন্যদিকে আঞ্চলিকভাবেও উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। কারণ, গণহত্যায় শহীদ বেশিরভাগ মানুষ ছিলেন চুকনগর ও ডুমুরিয়ার বাইরের অঞ্চলের। বিশেষ করে খুলনার অন্যান্য এলাকা এবং বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর, বরিশাল, ঝালকাঠিসহ দক্ষিণাঞ্চলের নানা জায়গা থেকে যারা এসেছিলেন তাদের স্বজনদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। স্বজনেরা হয়তো ভেবেছিলেন, তারা নিরাপদে ভারতে পৌঁছে গেছেন। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা আর ফিরে আসেননি।

ধ্বংস্তুপের মাঝে প্রস্ফুটিত ফুল
চুকনগর গণহত্যায় অজস্র শিশু হারিয়েছিল তাদের বাবা-মাকে। অনেক নবজাতককে চুকনগরসহ আশপাশে বহু গ্রামের মানুষ লালন-পালন করেছিলেন। এর মধ্যে এমনই এক শিশু ‘সুন্দরী বালা’।

এই গণহত্যার পরেরদিন ২১ মে সকালে বর্তমান চুকনগর কলেজের সামনে পাতখোলা বিলে বাবা চিকন আলী মোড়লের লাশ খুঁজতে গিয়েছিলেন মালতিয়া গ্রামের কৃষক এরশাদ আলী মোড়ল। এ সময় লাশের স্তুপের মধ্যে মৃত মায়ের স্তন থেকে দুধপানরত ৬ মাসের এক শিশুকন্যাকে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে শিশুটিকে বাড়ি নিয়ে যান। তিনি শিশুটির নাম রেখেছিলেন সুন্দরী। এদিকে সুন্দরীর মায়ের কপালে সিঁদুর ও হাতের শাঁখা দেখেছিলেন এরশাদ আলী মোড়ল। তাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী হিসেবে এক হিন্দু পরিবারেই বড় করিয়েছেন তাঁকে; বিয়েও দিয়েছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী পাত্রের সঙ্গে।

এক সাক্ষাৎকারে সুন্দরীবালা বলেছিলেন, “চুকনগর বধ্যভূমিতে গেলে আজো বুকটা হাহাকার করে ওঠে। খুঁজে ফিরি মা-বাবাকে। কিন্তু আমি তো জানি না, আমার পৈতৃকবাড়ি কোথায়? শুধু জানি, বাঁচার আশায় আমার পরিবার এখানে এসেছিলো।”

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ২০ মে চুকনগরে সংঘটিত হয়েছিলো ইতিহাসের নজিরবিহীন নৃশংসতা; যা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে ‘চুকনগর গণহত্যা’ দিবস হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে।

চুকনগর গণহত্যা দিবসের প্রাক্কালে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি শহীদদের। অবনত মস্তকে অভিবাদন জানাই তাঁদের অমর স্মৃতির প্রতি।

আশীষ কুমার দে: সাংবাদিক, লেখক, গবেষক ও অধিকারকর্মী।

তথ্যসূত্র:
১৯৭১: চুকনগরে গণহত্যা। সম্পাদনা: মুনতাসীর মামুন।
আহমাদ ইশতিয়াক; দ্য ডেইলি স্টার অনলাইন (বাংলা), ২০ মে, ২০২১।

শেয়ার করুন:
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০  
©germanbanglanews24
Developer Design Host BD