বাংলাদেশের একটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির এক সমাবেশে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের এক বক্তব্যের জবাবে চরমোনাইয়ের পীর ও ধর্মভিত্তিক দল ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য ও মন্তব্যে শিষ্টাচার বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) এক বিবৃতিতে এ কথা বলেন ধর্মভিত্তিক দলটির আমির, যাকে আগের দিন বিএনপির সমাবেশ থেকে আক্রমণ করা হয়।
বিবৃতিতে ইসলামী আন্দোলনের আমির বলেন, “রাজনীতিতে সমালোচনা–প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে। কিন্তু সীমা লঙ্ঘন করলে পতিত শক্তি সুযোগ নেবে।”
পুরান ঢাকায় এক ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের একটা বড় অংশ বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত ছিল বলে আবারও উল্লেখ করেন চরমোনাইয়ের পীর। তাঁর বক্তব্যের প্রমাণ হিসেবে পাঁচজনকে বিএনপি থেকে বহিষ্কারের কথাও তুলে ধরেন।
এই ব্যবসায়ী হত্যার পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে অশালীন স্লোগানের প্রতিবাদে আগের দিন নয়াপল্টনে সমাবেশ করে বিএনপি।
সেই সমাবেশে মির্জা আব্বাস জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও এনসিপিকে আক্রমণ করে বক্তব্য রাখেন।
ইসলামী আন্দোলনের আমিরকে উদ্দেশ করে বিএনপি নেতা সেই সমাবেশে বলেন, “এক লোকের দল… আমি নামটা তার বলতে চাই না। ওই লোকটি এবং তার দল যারা বলছে, শ্লোগান দিচ্ছে, ‘আওয়ামী লীগ গেছে যেই পথে, বিএনপি যাবে সেই পথে’।
‘’আরে বেটা, এত সহজ নাকি এটা? এতই সহজ? আমাদের কোথাও যাওয়ার রাস্তা নাই। এই বাংলাদেশ আমাদের স্থায়ী ঠিকানা।”
২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হামলার সময় চরমোনাইয়ের পীর সাহেব কোথায় ছিলেন?- এই প্রশ্ন রেখে মির্জা আব্বাস বলেন, “উনি কি মুসলমানদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন? দাঁড়ান নাই। কে দাঁড়িয়েছে? বিএনপি দাঁড়িয়েছে।”
চরমোনাইয়ের পীর ও ইসলামী আন্দোলনের আমির বলেন, ‘‘গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে এবং সে জন্যই পরস্পর সমালোচনা থাকে। কখনও কখনও তা তীব্রও হতে পারে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সীমা লঙ্ঘন করা যাবে না।”
বাংলাদেশ একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে বলে সতর্ক করে তিনি বলেন, “১৫ বছরের পতিত ফ্যাসিবাদের বিষাক্ত ছোঁয়া এখনও দেশকে অনিরাপদ করে রেখেছে। পতিত স্বৈরাচার দেশকে অস্থিতিশীল করে সুযোগ নেওয়ার পাঁয়তারা করে যাচ্ছে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজ দলের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
‘‘একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সমালোচনায়, বক্তব্যে ও মন্তব্যে শিষ্টাচারের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ, কোনো অবস্থাতেই পতিত ফ্যাসিবাদকে কোনো সুযোগ করে দেওয়া যাবে না।”
গণঅভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে কলঙ্কের দিন
জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছর পর ১৪ জুলাইকে দেশের ‘রাজনীতির জন্য সবচেয়ে কলঙ্কময়’ বলেও উল্লেখ করা হয় বিবৃতিতে।
ইসলামী আন্দোলনের আমির বলেন, “আমাদের সিনিয়র নায়েবে আমির তাঁর এক বক্তব্যে বিএনপির প্রতি পরামর্শ হিসেবে বলেছেন, ‘এই এই শ্লোগান মানুষ দিচ্ছে, আপনারা সতর্ক হোন’।
‘‘তার সেই বক্তব্য খণ্ডিত আকারে ছড়িয়ে পড়েছে এবং সেই খণ্ডিত বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশের ঐতিহাসিক সুফি ও সংস্কারধারা চরমোনাইকে কেন্দ্র করে রাজপথে নোংরা শ্লোগান দেওয়া হয়েছে।”

ইসলামী আন্দোলনের আমির ও চরমোনাইয়ের পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম।
বিএনপির মঞ্চ থেকে চরমোনাইয়ের মতো একটি আধ্যাত্মিক ধারাকে শায়েস্তা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ এনে বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ও এনসিপিকে কেন্দ্র করে পতিত ফ্যাসিবাদের ভাষায় ও ঢংয়ে শ্লোগান দেয়া হয়েছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক।
‘‘রাজনীতিকে এভাবে কলুষিত করা এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ করা বিএনপির মতো দলের পক্ষে শোভা পায় না।”
চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস কমেনি
৫ আগস্টের পরে রাজনৈতিক হানাহানিতে নিহত–আহত মানুষের সংখ্যা শুনে আঁতকে উঠতে হয় বলেও মন্তব্য করেন ইসলামী আন্দোলনের আমির।
তিনি বলেন, “চাঁদাবাজি কোনো অর্থেই কমে নাই, সন্ত্রাসও কমে নাই। বরং রাজনৈতিক পরিচয়ে ধর্ষণের মতো ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে।”
আরও পড়ুন: চাঁদাবাজি নিয়ে একটি দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে: চরমোনাই পীর
মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে যেভাবে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, তার প্রতিবাদে জনতা স্বাভাবিক কারণেই ফুঁসে উঠেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, “জনতার সেই প্রতিবাদকে রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে বর্বর সেই হত্যাকাণ্ডকে আড়াল করে ফেলা হয়েছে।”
জুলাই অভ্যুত্থানের পরে মানুষ এই ধরনের রাজনীতি দেখতে চায় না বলে মন্তব্য করে বিবৃতিতে বলা হয়, “এই ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের একটা বড় অংশ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিএনপি কর্তৃক তাদের বহিষ্কারের মাধ্যমে এটা প্রমাণিতও বটে। তাই বিএনপি নেতৃবৃন্দকে বলব, কর্মীদের অপরাধের দায়ভার দল হিসেবে আপনাদের বহন করতেই হবে।”
বিএনপির নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি
চরমোনাইয়ের পীর বলেন, “চাঁদাবাজরা বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ততা দেখিয়েই জনতার কাছ থেকে চাঁদা দাবি করে। তাই জনতার ক্ষোভ বিএনপির প্রতি হবে—এটা স্বাভাবিক।”
জনতার এই প্রতিবাদকে প্রতিপক্ষ না বানিয়ে দলের ভেতরে থাকা অপরাধীদের চিহ্নিত করার আহ্বানও জানান ইসলামী আন্দোলনের নেতা।
তিনি বলেন, “অপরাধ ঘটার আগে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। প্রকাশ্যে একজন মানুষকে পিশাচের নির্মমতায় হত্যা করার পরে আপনি জনতার কাছ থেকে মার্জিত ক্ষোভ আশা করতে পারেন না।”
গত ১০ মাসের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ আখ্যা দিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘‘সরকার কেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, তা জাতিকে ব্যাখ্যা করতে হবে। কোনো অদৃশ্য শক্তি যদি সমস্যা তৈরি করে—তাহলে তা মোকাবিলা করতে হবে।”
‘‘আমাদের গৌরবান্বিত সেনাবাহিনী ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার নিয়ে মোতায়েন থাকা অবস্থায় রাজনীতির এই পরিবেশ মেনে নেওয়া যায় না,” বলেন চরমোনাইয়ের পীর।