বিনয় দত্ত
১.
বেশ কয়েকদিন ধরে ধর্ষণ, শ্লীলতাহানী, ধর্ষণের পর হত্যা বা খুন আবারও আলোচনায় এসেছে। কেন একজন পুরুষ ধর্ষণ করে? কেন একজন পুরুষের নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস কমে যায়? কেন ৪ বছরের শিশু থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ বৃদ্ধা ধর্ষিত হন? এই সকল প্রশ্নের উত্তরে অনেকে বিভিন্ন মতও প্রকাশ করেছেন। কেউ বলছেন পোশাক দায়ী। কেউ বলছেন পোশাক নয়, পুরুষের পাশবিক আচরণ দায়ী। আবার কেউ কেউ বলছেন ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব দায়ী। কেউ এর জন্য রাষ্ট্র, সরকারকে দায়ী করছেন। কেউ আবার প্রগতিশীলদের দায়ী করছেন। মতামত তো ব্যক্তিগত, তাই কারো মতামতের বিরুদ্ধে আমি কিছু বলছি না।
আচ্ছা, যে পরিবার এই মহা সংকটে পড়েছেন তাদের জায়গায় নিজেদেরকে নিয়ে আমরা কি কখনো এর মূল কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছি? বা যে পরিবারের মেয়ে বা শিশুটি এই সমস্যার কবলে পড়ে আক্রান্ত হয়েছেন তাদের পক্ষ নিয়ে আমরা কতজন দাঁড়িয়েছি? সবাই এর দোষ, ওর দোষ দিচ্ছেন। মূল দোষটা কার তা পরে আলোচনা করছি।
ধর্ষণ তো ভয়ানক অপরাধ, ধর্ষণের পর খুন বা হত্যা আরো মহা অপরাধ। কোনো পরিণত বয়স্ক নারীর সম্ভ্রম কেড়ে নেয়ার অধিকার কেউ কাউকেই দেয়নি। আমি এই অপরাধকে খুনের সামিল মনে করি। আর ধর্ষণের পর যে ধর্ষক খুন বা হত্যা করে সে একাধিক খুনের অপরাধীর সামিল। আমার বিবেচনায় একজন খুনীকে যেই আইনের বিচার করা হয় একজন ধর্ষককেও সেই আইনে বিচার করা উচিত।
এখন প্রশ্ন হল, আমাদের দেশের এতো বড় বড় পদে নারীরা দাপটের সাথে কাজ করছেন তাহলে ধর্ষণের শাস্তি কেন মৃত্যুদণ্ড হচ্ছে না? বা নারী বর্জিত কোনো ক্ষেত্র এখন আর পাওয়া যাবে না, তাহলে তারাইবা কেন ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবী করছে না?
যে ধর্ষক, সে আমাদের সবার চোখে জঘণ্য অপরাধী। আমরা তাকে হাতের কাছে পেলে কি যে করবো তা বলে শেষ করতে পারবো না। এই ধর্ষক কিন্তু কারো ছেলে, কারো স্বামী, কারো বাবা, কারো ভাই, কারো বন্ধু বা কারো শত্রু। এই ধর্ষক কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি। দিনের পর দিন তিলে তিলে তৈরি হয়েছে। কিভাবে?
ধরুন, আপনি আপনার পরিবারে আপনার ছেলে সন্তানের সামনে আপনার মা অথবা স্ত্রীর সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করলেন। এই খারাপ আচরণ আপনার সন্তান প্রথমদিন দেখল। পরে অন্য কোনোদিন আপনি ভিন্ন কোনো প্রসঙ্গে আবারও একই কাজ করলেন। আপনার সন্তান আজকেও দেখল। ধীরে ধীরে আপনার সন্তানের মনে মা, বোন বা নারী জাতির প্রতি শ্রদ্ধা কমে যাবে। শ্রদ্ধা কমে যাওয়ার পরেই সেও একইভাবে খারাপ আচরণ করা শুরু করবে। যে ছেলে সন্তান পরিবারে যখন দেখবে মা, বোন বা নারী জাতির প্রতি তার বাবাই সম্মান দেখায় না, সে তখন পরিবার থেকে বাইরে গিয়ে একই আচরণ করবে। কারণে অকারণে নারী জাতির প্রতি তার ক্রোধ জেগে উঠবে। তার ভিতরকার ক্রোধ তখন তাকে অন্ধ করে দিবে। আর অন্ধ হলেই সে বাজে কাজ করতে পিছ পা হবে না।
এই যে সন্তানটি শিশু সময়ে প্রশ্রয় পেয়ে গেল, এই প্রশ্রয় তার জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের কাল হয়ে দাঁড়াবে। তাহলে একজন ধর্ষণকারী হিসেবে মূল দোষটা কার? আর প্রশ্রয়কারী যখন ধর্ষকে পরিণয় হয়ে যায় তখন পারিবারিক ভাবে, রাজনৈতিকভাবে বা প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে সেই ধর্ষককে আমরা আড়ালে নিয়ে যাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। যা আগামীদিনে নতুনভাবে ধর্ষক তৈরিতে ইন্ধন জোগায়।
২.
সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনে অসংখ্য মামলা হয়েছে। শুধু রাজধানী ঢাকায় নারী ও শিশু অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গত ১৫-১৬ বছরে যত মামলা হয়েছে, তার ৯৭ শতাংশের আসামিরা কোনো না কোনোভাবে পার পেয়ে গেছে। এই ১৫-১৬ বছরে প্রায় আট হাজার মামলা হয়েছে। এইসব মামলায় আসামিদের সাজার হার খুবই নগণ্য, ৩ শতাংশেরও কম। বেশিরভাগ মামলার আসামিরা বিচার শুরুর আগেই অব্যাহতি পেয়েছে। এমনকি কিছু কিছু ধর্ষণের মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করা হয়েছে। ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের জন্য হত্যা, যৌতুকের জন্য হত্যা, আত্মহত্যায় প্ররোচণা আর যৌন নিপীড়নের মতো বড় বড় অপরাধের সাথে জড়িত থাকার পরও অনেকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিচয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে হরহামেশা।
আচ্ছা, বনানীর দুই ছাত্রীর ধর্ষণের মামলা মূল আসামী আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদের বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি কি? এদেশে ধর্ষণের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বাস্তবায়ন হয়েছে এমনটা পাওয়া খুবই বিরল। ধর্ষণের ঘটনায় ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে গত ১৬ বছরে ৪ হাজার ৫৪১টি মামলা হয়েছে। মাত্র ৬০টি মামলায় দোষী ব্যক্তিরা শাস্তি পেয়েছে। আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড আর ধর্ষণের কারণে মৃত্যু ঘটলে তাতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। সময় এসেছে আইন পরিবর্তনের।
যদি দ্রুত বিচার আইনে ধর্ষণের আসামিদের সাথে সাথে কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি দেয়া হত, যদি কোনো ধরনের রাজনৈতিক বিবেচনায় ধর্ষণের মামলা প্রত্যাহার না হত, যদি দ্রুত বিচার আইনে শাস্তি দেয়ার পর পরই তা কার্যকর হত তবে দেশে ধর্ষণ কমে যেত।
৩.
ধর্ষণ বন্ধে পারিবারিক মূল্যবোধ বা সচেতনতা যেমন জরুরী তেমনি জরুরী ধর্ষকের কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি বাস্তবায়ন করা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুারো ও শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৮ লাখ ৪৯ হাজার নারী দিনমজুর শ্রমিক রয়েছেন। এরা সবাই অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। অপরদিকে কৃষিকাজ থেকে শুরু করে দেশ নিয়ন্ত্রণ সবক্ষেত্রে এখন নারীদের জয়জয়কার। নারীদের এই উন্নয়ন, এই অগ্রযাত্রা থেমে যাতে পারে শুধু ধর্ষণ বা নারী শ্লীলতাহানী বেড়ে যাওয়ার কারণে।
বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজপথ, গণপরিবহন কিংবা বিপণিবিতানের মতো উন্মুক্ত স্থানগুলোতে নারীদের লাঞ্ছনা হওয়ার ঘটনা বেশি ঘটে থাকে। শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, গৃহবধূ থেকে শুরু করে যেকোনো বয়সী নারীরা কোনো না কোনো সময়ে যৌন হয়রানি ও লাঞ্ছনার শিকার হন। গণপরিবহনগুলোয় নারীরা সবচেয়ে বেশি লাঞ্ছনার শিকার হয়ে থাকেন।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের এক সমীক্ষা থেকে জানা যায়, ৯৪ শতাংশ নারী গণপরিবহনে চলাচলের সময় কোনো না কোনো সময়ে মৌখিক, শারীরিক এবং যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
ছোট ছোট ঘটনাই বড় ঘটনার জন্ম দেয়। ছোট খাট প্রতিরোধে বড় আন্দোলনের সূচনা হয়। নারী ও শিশু ধর্ষণ বন্ধে প্রতিটি পরিবারকেই সচেষ্ট হতে হবে। এর জন্য রাষ্ট্রকে মানবিক মূল্যবোধ বৃদ্ধির জন্য জনসচেতনতামূলক কর্মসূচী যেমন নিতে হবে, তেমনি পরিবারে ছেলে সন্তানদের নারী জাতির প্রতি সম্মান দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক অপর্ণা সেন তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘একজন নারী তার পুরুষ প্রেমিককে না বলতেই পারে, তাতে ক্ষিপ্রতা প্রকাশ কোনো সভ্যতা নয়। আর পরিবারকেও বোঝাতে হবে না শোনাটা খারাপ কিছু নয়। এতে যেন নারীর প্রতি ছেলেটির সম্মান যেন না কমে।’
আমরা কেন এইভাবে ভাবতে পারি না? আমরা কেন ধর্ষককে প্রশ্রয় না দিয়ে কঠিনভাবে প্রতিরোধ করতে পারি না? আমরা কেন পরিবার থেকে নারীদের সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারি না? হয়তো আমরা পারবো। সেদিন হয়তো বেশি দূরে নয়।
বিনয় দত্ত
সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
benoydutta.writer@gmail.com