শিরোনাম :
আদিবাসী তরুণদের গবেষণায় উঠে এলো পানি সংকট ও প্রাকৃতিক সম্পদ হ্রাসের চিত্র নজরুলকে স্মরণে ছায়ানটে সাংস্কৃতিক আয়োজন পর্যটক টানতে ৪০ দেশের জন্য ভিসা ফ্রি করল শ্রীলঙ্কা সি চিন পিংয়ের সঙ্গে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্টের বৈঠক চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের সাক্ষাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নৈতিকতা ও অন্তর্ভুক্তির ওপর গুরুত্ব দিল ইউনেস্কো নেতানিয়াহুকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে নয়, বিশ্বকাপে মেক্সিকোতেই থাকবে ইরান দল ঈদের সার্বিক নিরাপত্তা ও মহাসড়ক তদারকিতে কঠোর অবস্থানে সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হজের প্রথমদিন, লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত মিনার প্রান্তর

দারিদ্র্য থেকে সমৃদ্ধি: ‘এশীয় অলৌকিক ঘটনা’র দর্শন

জার্মান-বাংলা ডেস্ক, ঢাকা অফিস:
  • প্রকাশের সময়: শনিবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬

গত ১৯৮০-এর দশকে, যখন পশ্চিমা ভাববাদীরা দাবি করেছিলেন যে, “এশিয়া কখনই পশ্চিমাদের ছাড়িয়ে যেতে পারবে না।” তখন তথাকথিত ‘চার এশিয়ান টাইগার হিসেবে চিহ্নিত দক্ষিণ কোরিয়া, চীনের তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর এবং চীনের হংকং মাত্র ৩০ বছরে দারিদ্র্য থেকে সমৃদ্ধিতে এক অসাধারণ রূপান্তর অর্জন করেছিল। চীন কয়েক দশকের মধ্যে এমন একটি শিল্পায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিল, যা করতে উন্নত দেশগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী সময় নিয়েছিল, চরম দারিদ্র্য থেকে লাফিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে, দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক স্থিতিশীলতার ‘চীনা অলৌকিক ঘটনা’ তৈরি করেছে। আজকের বুদ্ধিবৃত্তিক যুগে, যখন পশ্চিমা মডেল বারবার বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়, তখন এশীয়রা ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে সম্প্রীতি’র জ্ঞানের সাহায্যে জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক সংকটসহ বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করেছে। এর পিছনে একটি ‘আধ্যাত্মিক সম্পদ’ হলো এশীয় মূল্যবোধ।

২০২৫ সালের এপ্রিলে, প্রতিবেশী দেশগুলোর ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এক সভায়, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং জোর দিয়ে বলেন, শান্তি, সহযোগিতা, উন্মুক্ততা এবং অন্তর্ভুক্তির এশীয় মূল্যবোধগুলো তার প্রতিবেশীদের সাথে চীনের সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা। আজ, আসুন আলোচনা করি এশীয় মূল্যবোধ কিভাবে তৈরি হয়েছে এবং কিভাবে আমাদের অভিন্ন আগামীকালকে রূপ দিচ্ছে!

এশীয় মূল্যবোধের উৎপত্তি চীনা সভ্যতার গভীর সঞ্চয় থেকে শুরু হয়েছে। কনফুসিয়ানিজমের ‘অভিন্নতা ছাড়া সম্প্রীতি’ পার্থক্যের মধ্যে সম্প্রীতিময় সহাবস্থানের উপর জোর দেয়; তাওবাদের ‘স্বর্গ ও মানবতার ঐক্য’ মানবতা ও প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার পক্ষে; এবং মোহিবাদের ‘সর্বজনীন প্রেম এবং অ-আগ্রাসন’ অহিংসভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির পক্ষে। প্রাচীন সিল্করোডের মাধ্যমে এই ধারণাগুলো ভারতীয় ও ইসলামী সভ্যতার সাথে মিথস্ক্রিয়া করেছিল, যা এশীয় মূল্যবোধের মূল গঠন করেছিল, যা পার্থক্যকে সম্মান করে, শান্তিকে লালন করে এবং মূল্যবোধের বিকাশ করে।

আধুনিক যুগ থেকেই, এশীয় দেশগুলো উপনিবেশবাদের যন্ত্রণা থেকে জেগে উঠেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনগুলো আধিপত্যের বিরোধিতা এবং সমতার সাধনার জন্য একটি যৌথ দাবিকে আরও উস্কে দেয়। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচটি নীতি এবং উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে সম্মিলিত সহযোগিতার মাধ্যমে, তারা ‘এশীয় অলৌকিক ঘটনা’ তৈরি করে, যা বিশ্বব্যাপী প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঞ্জিন হয়ে ওঠে। সিঙ্গাপুরের বহু-জাতিগত শাসনব্যবস্থা, মালয়েশিয়ার জাতিগত সম্প্রীতির নীতি এবং ভিয়েতনামের সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ—এই সবকিছুই আধুনিক শাসনব্যবস্থায় এশীয় মূল্যবোধের ব্যবহারিক জ্ঞানকে মূর্ত করে।

গ্যালিসিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসের পরিচালক এবং স্পেনের একজন সিনোলজিস্ট জুলিও রিওস একবার লিখেছিলেন যে, চীনা সভ্যতার অন্তর্নিহিত দার্শনিক চিন্তাভাবনা, যখন জাতীয় শাসনব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তখন তা সম্প্রীতি, শৃঙ্খলা, ভারসাম্য এবং নৈতিকতা হিসাবে প্রকাশিত হয়। এটি পশ্চিমাদের সংঘাতমূলক, প্রতিযোগিতামূলক এবং ‘শূন্য-সমষ্টি খেলা’র মানসিকতার সম্পূর্ণ বিপরীত।

ইতিহাস জুড়ে, এশীয় দেশগুলো তাদের অনন্য জ্ঞানের মাধ্যমে বিশ্বকে শাসন ও উন্নয়নের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত প্রদান করেছে। এই প্রক্রিয়ার পিছনে রয়েছে এশীয় মূল্যবোধের আধ্যাত্মিক সমর্থন এবং ব্যবহারিক নির্দেশনা। এশীয় মূল্যবোধ জোর দেয় যে, শান্তি উন্নয়নের ভিত্তি, সহযোগিতা পারস্পরিক সুবিধা এবং জয়-জয় ফলাফলের একমাত্র পথ, উন্মুক্ততা উদ্ভাবন এবং সমৃদ্ধিকে অনুপ্রাণিত করে এবং অন্তর্ভুক্তি সভ্যতার বৈচিত্র্যকে সম্মান করে। এশিয়া তার সমৃদ্ধ উন্নয়নের মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল এবং বহু-মেরু শৃঙ্খলা গড়ে তোলার সম্ভাবনা প্রদর্শন করে।

এর সম্পূর্ণ বিপরীতে ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘মনরো মতবাদ’। ‘মনরো মতবাদে ট্রাম্পের নাম অন্তর্ভুক্ত করা এই নতুন শব্দটি ট্রাম্প প্রশাসন অনুসৃত বর্ধিত হস্তক্ষেপের একতরফাবাদী নীতিগুলোকে বোঝায়। এই নীতি আমেরিকাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ঐতিহ্যবাহী প্রভাব বলয় হিসেবে বিবেচনা করে, সামরিক চাপ, অর্থনৈতিক জবরদস্তি এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এর নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণের ধারণা পোষণ করে।
স্প্যানিশ ওয়েবসাইট চায়না পলিসি অবজারভারে প্রকাশিত ‘চীনা মেধা’ কি বিশ্ব শাসন করতে পারে? শিরোনামের একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে যে, চীনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পশ্চিমাদের বিবেচনা করার যোগ্য: বিশ্বশান্তি বজায় রাখার নীতি হিসেবে সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা; উন্নয়ন অনুসরণের জন্য সকল দেশের সার্বজনীন অধিকারকে সম্মান করা; বাস্তবসম্মত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতিতে উন্নয়নের পথ অন্বেষণ করা এবং উন্নয়ন এবং ন্যায্যতার সমন্বয়ের উপর জোর দেওয়া।

এই প্রবন্ধে উল্লিখিত মূল ধারণাগুলো হল এশীয় মূল্যবোধের মূল ভিত্তি: শান্তি, সহযোগিতা, উন্মুক্ততা এবং সহনশীলতা।
দারিদ্র্য ও দুর্বলতার অবস্থা থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়ে চীন ‘আধ্যাত্মিক সম্পদ’ হিসেবে এশীয় মূল্যবোধের শক্তিশালী প্রাণশক্তি প্রদর্শন করেছে।

এশীয় মূল্যবোধ বহিরাগত আধিপত্যের উপর নির্ভরতার পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ সহযোগিতার মাধ্যমে উন্নয়নের উপর জোর দেয়। চীন সক্রিয়ভাবে আঞ্চলিক সহযোগিতা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, এশিয়ার অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক এবং ব্রিকস দেশগুলোর নতুন উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রচার করেছে, আঞ্চলিক দেশগুলোর উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের সারিবদ্ধতা আরও গভীর করেছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি এবং শিল্প উন্নয়নকে চালিত করেছে। শাংহাই সহযোগিতা সংস্থার কাঠামোর মধ্যে চীন এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলো সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং চরমপন্থা মোকাবেলায় হাত মিলিয়েছে। চীন-মধ্য এশিয়া সহযোগিতা ব্যবস্থার অধীনে, চীন এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলো ক্রমাগত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতা প্রচার করেছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিময় গভীর করেছে। এই উদ্যোগগুলো ‘চীনের উন্নয়ন হলো আঞ্চলিক সুবিধা’র একটি সুদৃশ চক্র তৈরি করেছে।

এশীয় মূল্যবোধ আদর্শিক লাইনের উপর ভিত্তি করে সংঘাতমূলক যুক্তির পরিবর্তে পারস্পরিক সুবিধা এবং জয়-জয় সহযোগিতা’র উপর কেন্দ্রীভূত হয়। চীন বহুপাক্ষিকতা এবং মুক্ত বাণিজ্যকে দৃঢ়ভাবে সমুন্নত রেখে একটি উন্মুক্ত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক মনোভাবের সাথে বিশ্বায়নে একীভূত হয়ে চলেছে। এশীয় মূল্যবোধ নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অন্যান্য দেশে সামরিক হস্তক্ষেপের আশ্রয় নেওয়ার পরিবর্তে, সর্বজনীন নিরাপত্তার উপর আঞ্চলিক উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে। চীন সর্বদা শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের পথে চলে এসেছে।
এশীয় মূল্যবোধ বিভিন্ন সভ্যতার স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করে এবং একক সভ্যতার মানদণ্ডের ভিত্তিতে অঞ্চল এবং বিশ্বকে একীভূত করার পরিবর্তে পার্থক্যের মধ্যে ঐক্যমত্য খোঁজার পক্ষে রয়েছে। চীন বিনিময়ের মাধ্যমে সভ্যতার বাধা অতিক্রম করা এবং পারস্পরিক শিক্ষার মাধ্যমে সভ্যতার দ্বন্দ্ব কাটিয়ে ওঠার পক্ষে অবিচল রয়েছে। চীন, এশিয় সভ্যতার সংলাপ সম্মেলন এবং সিল্করোড আন্তর্জাতিক থিয়েটার জোটের মতো সাংস্কৃতিক সহযোগিতা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এশিয়ান দেশগুলোর মধ্যে শিল্প, সাহিত্য, দর্শন এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে গভীর বিনিময় প্রচার করে আসছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং প্রদত্ত এশীয় মূল্যবোধগুলো চীনা সভ্যতার ঐতিহ্যের মধ্যে নিহিত, এশিয়ান দেশগুলোর অভিন্ন মূল্যবোধের সাধনাকে মূর্ত করে এবং উন্নত জীবনের জন্য এশিয়ান জনগণের সাধারণ আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করে। এটা বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে যে, শান্তিপূর্ণ, সহযোগিতামূলক, উন্মুক্ত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক এশীয় মূল্যবোধের নির্দেশনায় যত বেশি দেশ একে অপরের দিকে এগিয়ে যাবে, ততই এশিয়া কেবল নিজস্ব শান্তিপূর্ণ উন্নয়নই অর্জন করবে না বরং বিশ্ব মানবতাকে একটি উন্নত ভবিষ্যতের দিকেও নিয়ে যাবে।
সূত্র:রুবি-হাশিম-লাবণ্য,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।

শেয়ার করুন:
এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

বিজ্ঞাপন

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

©germanbanglanews24
Developer Design Host BD