নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর মিরপুর দারুস সালামের একটি সরকারি কোয়ার্টারে দুই সন্তানসহ মায়ের মৃত্যুরহস্য তিনদিনেও উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মানসিক অবসাদগ্রস্ত মা তার দুই মেয়েকে খুন করে আত্মহত্যা করেছেন। তিনজনের শরীরেই ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। পুলিশ বলছে, ঘটনাটি আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড এ প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও অপেক্ষা করতে হবে। ঘটনার তিনদিন পার হলেও গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো মামলা হয়নি।
এদিকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে রাজধানীর মিরপুরের পাইকপাড়ায় মা ও দুই মেয়ের মৃত্যু হয়েছে জানিয়েছেন সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সেলিম রেজা। গত মঙ্গলবার লাশ তিনটির ময়নাতদন্ত শেষে তিনি এ কথা বলেন। ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়। গতকাল পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে তাদের লাশ দাফন করা হয়।
সেলিম রেজা বলেন, আঘাতের আগে তাদের কোনো ধরনের বিষ বা এ জাতীয় কিছু খাওয়ানো হয়েছিল কিনা এ জন্য তাদের ভিসেরা নমুনাও সংরক্ষণ করা হয়েছে। নিহত তিনজনের শরীরেই ধারালো অস্ত্রের জখম পাওয়া গেছে। ধারালো ছুরিকাঘাতের পর রক্তক্ষরণে তারা মারা যান। তবে হত্যা না আত্মহত্যা, সেটি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর জানা যাবে।
গত সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে দারুসসালাম থানা এলাকার মিরপুর সরকারি কোয়ার্টার থেকে মা জেসমিন আক্তার (৩৫), তার মেয়ে হাসিবা তাহসিন হিমি (৯) ও আদিলা তাহসিন হানির (৪) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মিরপুরের পাইকপাড়া সি-টাইপ সরকারি কোয়ার্টারের ১৩৪ নম্বর ভবনের চতুর্থ তলার ফ্ল্যাটে থাকত পরিবারটি। নিহত জেসমিন আক্তার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ক্যাশিয়ার ছিলেন। তার স্বামী হাসিবুল ইসলাম সংসদ সচিবালয়ের সহকারী লেজিসলেটিভ ড্রাফটসম্যান।
পুলিশ জানায়, ঘটনার সময় নিহতের স্বামীর ভাগিনা রওশন জামিল এবং তার স্ত্রী রোমানা পারভীন ও নিহত জেসমিনের খালাতো বোন রেহানা বাসায় ছিলেন। রওশন জামিল ও তার স্ত্রী বাসায় সাবলেট থাকেন। তারা পাশের রুমে ঘুমিয়ে ছিলেন; কিন্তু তারা কেউই কোনো ধরনের চিৎকারের শব্দ শোনেননি বলে প্রাথমিকভাবে পুলিশকে জানান।
নিহত জেসমিনের ছোট ভাই শাহিনুর ইসলাম ওই বাসাতেই থাকেন। ঘটনার সময় তিনি খালাতো বোন রেহেনার জন্য বাসের টিকিট কিনতে গিয়েছিলেন। শাহিনুর বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, দুই ঘণ্টায় একটি রুমের ভেতরে দরজা বন্ধ করে দুটি বাচ্চাকে ছুরি দিয়ে হত্যা করা হলো, অথচ কেউ কিছু জানতে পারল না!
জেসমিনের খালাতো বোন রেহানা পারভীন জানান, তার আপা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে মাইগ্রেনের চিকিৎসা করাতেন। মানসিক রোগী ছিলেন না। তবে মানসিকভাবে খুব বিপর্যস্ত ছিলেন। সন্তানদের জন্য দুশ্চিন্তা করতেন।
বাসার পাশের মুদিদোকানি আব্দুল আহাদ বলেন, বড় মেয়েটা আমার মেয়ের সঙ্গে দেড়টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত পাশের মসজিদে আরবি পড়ত। সোমবারও সে মসজিদে আরবি পড়তে গিয়েছিল। বাচ্চা দুটি প্রায়ই আমার দোকানে আসত। আমার কাছ থেকে হাসিবুল ও জেসমিন ছোটখাট বাজার করতেন। তাদের আচরণ কখনো অস্বাভাবিক মনে হয়নি।
ডিএমপির মিরপুর বিভাগের দারুস সালাম জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (এসি) জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঘটনাস্থলে পারিপার্শ্বিক সব বিষয়ে বিবেচনা করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যাচ্ছে দুই শিশুকে হত্যার পর তাদের মা নিজে আত্মহত্যা করেন। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে বলা যাবে। এ ছাড়া কী কী কারণে হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে।
মাসহ দুই মেয়ের লাশ দাফন
আমাদের তেঁতুলিয়া প্রতিনিধি জানান. দুই মেয়েসহ মায়ের লাশ তেঁতুলিয়া দাফন হয়েছে। নিহতের স্বামী হাসিবুল ইসলামের বাড়ি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়।
এর আগে মঙ্গলবার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে লাশ ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকায় জানাজা হয়। জানাজায় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা অংশ নেন।