গত কয়দিন ধরে ভাপসা গরমের সাথে প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে। এমনিতেই এপ্রিল মে মাসের এই দিনে, ঝড়বৃষ্টি সহ দমকা হাওয়াও থাকে। সাথে থাকে তুফান নামের আলামত। আর বজ্র সহ বৃষ্টি। যাকে বলে কালবৈশাখী। আগে বৈশাখের আগমনে সবাই কালবৈশাখী ঝড়ো হাওয়ার কথাই বেশি ভাবত। এখন আর শহরে বসবাসকারীদের তেমন একটা ভাবতে হয় না। কারণ,পুরো শহরটাই থাকে চার দেয়ালে ঘেরা। গাছ-পালা, আর ফসলি জমি খুব একটা বেশি নেই। দিন যাচ্ছে, শহরের গাছ-গাছালি কমছে। কমে যাচ্ছে কৃষকের ফসলি জমি। তাই চৈত্রমাস শেষ হতে-না-হতেই শুরু হয় গরমের সাথে ঝড়বৃষ্টি। আর বজ্র সহ তুফানের আলামত। গত কয়েকদিনের এরকম আলামতের কারণে আমাদের দেশে বজ্রাঘাতে প্রাণ হারিছে, প্রায় ৪০ জনেরও বেশি। যা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার খবর পড়ে জানা যায়।
ছোটবেলাও এরকম ঝড়-তুফান আর বজ্রপাত দেখিনি। যা হয়েছে, তা কেবল কয়েক বছর পরপর হঠাৎ করেই হত। এটাকে বলা হত প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মৌসুমি দুর্যোগ। বর্তমানে আগেকার সে-সব ঝড়-তুফানকে হার মানিয়ে দিচ্ছে এবারের বৈশাখে। এরকম হওয়াটাও স্বাভাবিক বলেই মনে হচ্ছে। কারণ, আমাদের চারিপাশে আগেরমত গাছ-পালা বেশি নেই। তাই মনে হচ্ছে, প্রচণ্ড গরমের সাথে এত ঝড়-তুফান। ছোটবেলা দেখতাম, বাড়িঘরের সামনে পেছনে লাগানো থাকত নানারকম গাছ-পালা। ঝড়-তুফান হলে গাছের ঢালা বা গাছ ভেঙে পড়ত। তুফানে গাছ ভেঙে পড়ত ঠিক, রক্ষা পেত বাড়ির ঘরদোর। তুফানের কবল থেকে বাড়িঘর এই গাছেরাই রক্ষা করে রাখত। আবার খালি মাঠের জমিতে কাজ করা কৃষকরা ঝড়-তুফানের টের পেলে, মাঠের পাশে থাকা বড়বড় গাছের নিচে আশ্রয় নিত। তাঁরা বজ্র সহ বৃষ্টিতে বজ্রাঘাত থেকে রক্ষা পেত। বড়দের মুখে শুনেছি, গাছেরা নাকি গরম আর ঝড়-তুফানকে প্রতিহত করতে সক্ষম। এখন সেই আগের মতন গাছ-পালা নেই। ঝড়-তুফানকে প্রতিহত করারও কেউ নেই। তাই এত গরম, এত শীত। আর এত বজ্র সহ ঝড়-তুফান।
কয়দিন আগে প্রচণ্ড গরমের এক দুপুরবেলার কথা। আকাশে কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে। অথচ ভাপসা গরমে জীবন যাবার পালা। রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাসায় যাচ্ছিলাম। শুক্রবার জুম্মার দিন। দোকান-পাট সব বন্ধ। একটা রিকশাও পাচ্ছি না। পুরো রাস্তার আশ-পাশ নীরব নিস্তব্ধ। সেই দুপুরের সময়টা একেবারে জনশূন্য। হাঁটতে পারছিলাম না! গরমে শরীর থেকে অতিরিক্ত ঘাম ঝরার কারণে, পা দুটি আর চলছিল না। রাস্তার ধারে ছোট একটা খেলার মাঠ। মাঠের এককোণে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। গাছের নিচে রোদের ছায়া পড়েছে। গাছের নিচেকার জায়গাটায় ছায়া দেখে, গাছতলায় গিয়ে ঘাসের ওপরে বসলাম। আগে এই মাঠের চারদিকেই অনেক গাছ-গাছালি ছিল। এখন ওইরকম গাছ-গাছালি নেই। যা আছে, তা কেবল হাতে গোনা কয়েকটা মাত্র। বড় গাছের মধ্যে এই কৃষ্ণচূড়া গাছটাই আছে। আর যা আছে, সে গুলো ছোট-ছোট। ছোট গাছেগুলোর ঢালা-পালা তেমন নেই বলে ছায়াও নেই। তাই গরম থেকে বাঁচতে আশ্রয় নিয়েছি কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে। ঘাসের উপরে বসে শরীর থেকে জামা খুলতে লাগলাম। খালি গায়ে শরীরে বাতাস বেশি লাগবে বলে।
এমন সময় হঠাৎ কে যেন বলতে লাগল, “এখানে বসবে না।”
এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলাম কেউ নেই! তা হলে কথা বলল কে? চারদিক তাকিয়ে দেখলাম কেউ নেই। কাউকে না দেখে, একটু পোক্ত করে বসার চেষ্টা করলাম। ছোটবেলা শুনতাম, ভরদুপুরে নাকি ফাঁকা জায়গায় ভূতপ্রেতে মানুষের ওপর আশ্রয় করত। কিন্তু আমি ওইসব চিন্তায় গেলাম না। নিজেরভাবে গায়ের জামা খুলতে লাগলাম। জামা খুলে একটু ভালো করেই বসলাম। ভালোই লাগছিল কৃষ্ণচূড়া গাছের সুশীতল ছায়া।
আবার বলতে গাগল, “তোমাকে এখানে বসতে বারণ করেছি। তারপরও আবার তুমি বসলে?”
ভয় পেয়ে গেলাম! কাউকে দেখছি না, অথচ কথার আওয়াজ কানে আসছে! কে কথা বলছে?
এবার নিজেকে সামলিয়ে বললাম, “কে কথা বলছ?”
উওর এলো, “আমি কৃষ্ণচূড়া বলছি!”
আমি বললাম, “কৃষ্ণচূড়া! গাছ কি কখনও কথা বলতে পারে?”
কৃষ্ণচূড়া বলল, “হ্যাঁ পারে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে গাছেরা কথা বলে না। তোমাকে একা পেয়ে তোমার সাথে কথা বলছি। তোমাকে এখানে বসতে বারণ করেছি। কেন বারণ করেছি, তা তুমি জান?”
আমি পুরো-পুরিভাবে থ বোনে গেলাম। আমার মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলার জোগাড়। তারপরও উপায়ান্তর না দেখে আমি আমতা-আমতা করে জবাব দিলাম, “না।”
কৃষ্ণচূড়া বলল, “শোন তা হলে। তোমরা আমাদের ভালোবাসো না। আমরা তোমাদের ভালোবেসে ছায়া দিবো কেন? আমরা বৃক্ষজাত তোমাদের জন্য ফল জন্ম দেই। তোমরা আমাদের জন্মানো ফল খেয়ে শরীরে বল বাড়াও। অথচ আমরা নিজেরা সেই ফল খাই না। আমরা নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়ে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে তোমাদের রক্ষা করি। অথচ তোমরা আমাদের স্বজাতি নিধন করছ। তোমরা আমাদের নিধন করে আমাদের হার- গোড় দিয়ে তোমাদের বাসস্থান নির্মাণ করছ। তাতে আমাদের বিন্দুমাত্র দুঃখ নেই। কারণ, তোমরা বেঁচে থাকলে আমরাও বেঁচে থাকতে পারব। তোমরা আমাদের যত্ন করবে, আমাদের পরিচর্যা করবে। তোমাদের পরিচর্যা আর ভালোবাসায় আমরা তোমাদের আরও বেশিবেশি ফল দিব। তোমাদের হাতের ছোঁয়ায় আমাদেরও বেশিবেশি বংশবৃদ্ধি হবে। এই আশা নিয়েই তোমাদের দিকে আমরা তাকিয়ে থাকি।
“দুঃখ হয় তখন, যখন দেখি একটা গাছ কেটে আরেকটা গাছ তোমরা আর রোপণ করো না। আমাদের বংশবৃদ্ধির কথা তোমরা মোটেও ভাবছ না। সময়সময় দেখি আমাদের শতবর্ষী দাদা-দাদীদেরও (শতবর্ষী গাছ) তোমরা কেটে ফেলছ। আমাদের বংশ নির্বংশ করে ফেলছ। তোমরা আসলে বেঈমান জাতি। শুধু পেতেই চাও, কিন্তু দিতে চাও না।
আচ্ছা! আমরা যদি না থাকি, তা হলে সাগরের জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে; উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের বাঁচাবে কে? আমরা আছি বলেই তো, উপকূলীয় অঞ্চলের দুর্যোগ থেকে তোমাদের কিছুটা সাহায্য করতে পারি। আমরা আছি বলেই, এই পৃথিবীতে পাখি আছে। পাখিরা আমাদের ঢালে বাসা বাঁধে। গাছের ঢালে বসে মধুর কণ্ঠে তোমাদের গান শোনায়। পাখিরা সকালবেলা তোমাদের ঘুম থেকে ডেকে তোলে। জেনে রাখো, আমরা যদি না থাকি পাখি থাকবে না। তোমরাও পাখির গান শুনতে পারবে না। গাছ না থাকলে পাখির গান তোমাদের শোনাবে কে? গাছ না থাকলে তোমাদের ফল-ফুল দিবে কে? আমরা যদি না থাকি, ঝড়-তুফান থেকে তোমাদের রক্ষা করবে কে? তুমি হয়তো বলতে পার রক্ষা করার মালিক সৃষ্টিকর্তা। মহান সৃষ্টিকর্তাই ঝড়-তুফান, জলোচ্ছ্বাস, রোদ-বৃষ্টি, ঠাণ্ডা-গরম থেকে তোমাদের কিঞ্চিত রক্ষা করার জন্য আমাদের সৃষ্টি করেছে। আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করার জন্যই দাঁড়িয়ে থাকি যুগের পর যুগ ধরে, শুধু তোমাদের জন্য।
“তোমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী করে? তাঁরা আক্রমণকারীদের হাত থেকে তোমাদের রক্ষা করে। ঠিক তেমন করে আমরাও তাঁদের মতন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে তোমাদের রক্ষা করার প্রস্তুতি নিয়ে থাকি। গরমে ছায়া দেই, ঠাণ্ডা দেই।বৃষ্টির দরকার হলে, তোমাদের আগে আমরাই সৃষ্টিকর্তার কাছে ফরিয়াদ করি। বাতাসের সাথে লড়াই করি। তুফানের সাথে যুদ্ধ করি। তোমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য আমরা অক্সিজেন তৈরি করি। তোমাদের রান্না-বান্নার জন্য আমরা জ্বালানি দেই। খাট- পালঙ্ক, বাসস্থান তৈরি করার জন্য কাঠ দেই। প্রখর রোদ থেকে তোমাদের খাদ্যশস্যও রক্ষা করে থাকি। তারপরও আমাদের জন্য তোমাদের একটু মায়াও লাগে না? তোমরা বেঈমান নিদয়া জাতি।”
কৃষ্ণচূড়া গাছের কথা শুনে আমার খুবই কষ্ট হচ্ছিল। সত্যিই তো! আমরা যেখানে-সেখানে গাছ কেটে সাফা করে ফেলছি। অথচ একটা গাছ কাটার পর আরেকটি গাছ আমরা রোপণ করছি না। তাই তো দিনদিন আমাদের চারপাশ থেকে গাছ-পালা কমে চাচ্ছে। বাড়ছে গরম। বাড়ছে শীত। পৃথিবী হারাচ্ছে ভারসাম্য। বৃষ্টিপাতের সাথে হচ্ছে বজ্রপাত। বাড়ছে ঝড়-তুফানের সাথে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। উপকূলীয় অঞ্চলে সময়সময় দেখা দেয় ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস। সেই জলোচ্ছ্বাসের থাবা থেকে সর্বপ্রথম গাছই তো আমাদের রক্ষা করে!
এই তো! আমি প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে এসেছি কৃষ্ণচূড়ার তলে। এই কৃষ্ণচূড়া গাছটি যদি না থাকতো, তা হলে আমার বর্তমান অবস্থাটা একটু খারাপই হত। তাই আমাদের উচিৎ, একটা গাছ কাটার আগে আরেকটি গাছ লাগানো। তা হলেই আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীতে আর গাছের অভাব হবে না। পৃথিবীও ভারসাম্য হারাবে না। পাখিরাও মনের সুখে গাছের ঢালে বসে গান গাইবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগেও বেশি মানুষ হতাহত হবে না। তালগাছ সহ উঁচু উঁচু গাছা থাকলে বজ্রপাতে মানুষ হতাহত হবে না। পৃথিবীর সৌন্দর্য রক্ষায় কৃষ্ণচূড়ার মতন নানারকম গাছেরও অভাব হবে না।
আসুন সবাই বেশি করে গাছ লাগাই, পরিবেশ বাঁচাই।
দ্রষ্টব্য: লেখায় কৃষ্ণচূড়া গাছটি দিয়ে দৃষ্টান্ত স্বরূপ সবাইকে বুঝানো হয়েছে।