অ্যামাজন অঞ্চলে টানা চতুর্থ বছরের মতো বন উজাড়ের হার কমেছে বলে জানিয়েছে ব্রাজিল সরকার। জাতিসংঘের আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনের আগে এই তথ্য দেশটির জন্য বড় স্বস্তির বার্তা হিসেবে এসেছে। বিশ্বের নয়টি দেশে বিস্তৃত অ্যামাজন রেইনফরেস্টের সবচেয়ে বড় অংশ ব্রাজিলে অবস্থিত, যা বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বনাঞ্চলের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে ব্রাজিলের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্চ (আইএনপিই)। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার ৭৯৬ বর্গকিলোমিটার প্রাকৃতিক বনভূমি ধ্বংস হয়েছে—যা আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ কম এবং ২০১৪ সালের পর সর্বনিম্ন। আইএনপিই-এর সমন্বয়ক ক্লাউদিও আলমেইদা জানিয়েছেন, এটি টানা চতুর্থ বছর যখন বন উজাড়ের হার হ্রাস পেয়েছে।
ব্রাজিলের মধ্যাঞ্চলের সাভান্না অঞ্চল সেরাদোতেও বন উজাড় ১১ শতাংশ কমেছে। অ্যামাজন বন পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ কার্বন সংরক্ষণাগার, যা বিপুল পরিমাণ কার্বন শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সহায়তা করে।
পরিবেশমন্ত্রী মারিনা সিলভা বলেন, “যখনই আমরা কোনো সাফল্য অর্জন করি, তখনই নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে আসে। আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। আমাদের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বন উজাড় সম্পূর্ণরূপে শূন্যে নামিয়ে আনা।”
বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ২০২৩ সালে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে বন সংরক্ষণকে সরকারের প্রধান লক্ষ্য ঘোষণা করেন। আগামী নভেম্বরে অ্যামাজনের বেলেম শহরে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন ‘কপ৩০’-এর আয়োজনকে সামনে রেখে বন সংরক্ষণ এখন ব্রাজিল সরকারের শীর্ষ অগ্রাধিকার।
ব্রাজিল বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী রাষ্ট্র হলেও, অন্যান্য দেশের মতো এর মূল উৎস জীবাশ্ম জ্বালানি নয় বরং বৃক্ষ নিধন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিকাজ এবং পশুপালনের জন্য বন উজাড়ই এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ। দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় গরুর মাংস রপ্তানিকারক হওয়ায় গবাদি পশুর চারণভূমি তৈরি করতে আগুন দিয়ে জমি পরিষ্কার করার ফলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ২০২৪ সালে এই ধরনের আগুনে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ হেক্টর বনভূমি পুড়ে যায়।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী সচিব জোয়াও পাওলো ক্যাপোবিয়ানকো বলেন, “যদি অস্বাভাবিক আবহাওয়া ও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড না ঘটত, তাহলে এ বছরই ইতিহাসের সর্বনিম্ন বন উজাড়ের রেকর্ড তৈরি হতো।”
সাবেক ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জায়ের বলসোনারোর আমলে দুর্বল পরিবেশ নীতি ও ভূমি উন্মুক্তকরণ নীতির কারণে অ্যামাজন উজাড় ব্যাপকভাবে বেড়েছিল। লুলা সরকার আবারও পরিবেশ সংরক্ষণে জোর দিচ্ছে এবং জলবায়ু নেতৃত্বে ব্রাজিলকে সামনে আনতে কাজ করছে।
তবে সম্প্রতি অ্যামাজন নদীর মোহনায় তেল অনুসন্ধান প্রকল্পে অনুমোদন দেওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েছেন লুলা। তিনি দাবি করেছেন, তেল অনুসন্ধান থেকে প্রাপ্ত অর্থ পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে। কিন্তু পরিবেশবাদীদের মতে, এই পদক্ষেপ ‘কপ৩০’-এর আয়োজক দেশ হিসেবে ব্রাজিলের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।