বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ জোরালো হতে যাচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জুলাই সনদের ওপর গণভোট পর্যবেক্ষণে ১৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি পর্যবেক্ষক দল পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে কমনওয়েলথ। নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রণের পরিপ্রেক্ষিতে লন্ডনে অবস্থিত কমনওয়েলথ সদর দপ্তর থেকে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।
বুধবার প্রকাশিত কমনওয়েলথের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচ.ই. নানা আকুফো আসোর নেতৃত্বে অভিজ্ঞ ও বহুজাতিক এই পর্যবেক্ষক দল বাংলাদেশে আসবে। রাজনীতি, আইন, নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, গণমাধ্যম, মানবাধিকার ও জেন্ডার ইস্যুতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত এই দল নির্বাচন ও গণভোটের সামগ্রিক প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
কমনওয়েলথের মহাসচিব শার্লি বচওয়ে বলেন, বাংলাদেশে একযোগে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কমনওয়েলথ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছে। তার ভাষায়, “বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনী প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ভিত্তি। বাংলাদেশে আমাদের পর্যবেক্ষক দল পাঠানো সেই মৌলিক বিশ্বাসেরই প্রতিফলন।”
তিনি আরও বলেন, এই উপস্থিতি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম নয়; বরং বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করার একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার। একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের পাশে থাকার বার্তাই এতে প্রতিফলিত হচ্ছে।
পর্যবেক্ষক দলের সদস্যদের তালিকাও বৈচিত্র্যপূর্ণ ও অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। এতে রয়েছেন অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার ক্যারিবিয়ান উইমেন ইন লিডারশিপের প্রেসিডেন্ট লেব্রেখটা নানা ওয়ে হেসে-বেইন, কানাডার যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ নীল ফিলিপ ফোর্ড, ফিজির প্যাসিফিক ইয়ুথ কাউন্সিলের সমন্বয়ক মিলিয়ানা ইগা রামাতানিভাই, মালয়েশিয়ার সাবেক সিনেটর দাতুক (ড.) রাস আদিবা মোহদ রাদজি এবং মালদ্বীপের সাবেক পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী এইচ.ই. জোফ্রি সালিম ওয়াহিদ।
এ ছাড়া মরিশাসের নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মাদ ইরফান আবদুল রহমান, সিয়েরালিওনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী অধ্যাপক ডেভিড জন ফ্রান্সিস, সিঙ্গাপুরের মানবাধিকার আইনজীবী সঙ্গীথা যোগেন্দ্রন, দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাচন কমিশনের সাবেক প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তা অধ্যাপক ম্যান্ডলা মচুনু, শ্রীলঙ্কার কলম্বো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দিনেশা সমরারত্নে, উগান্ডার অধ্যাপক উইনিফ্রেড মেরি তারিনিয়েবা কিরিয়ারউইরে, যুক্তরাজ্যের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষজ্ঞ রোজমেরি আজাই এবং জাম্বিয়ার সাবেক প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তা ক্রিটিকাস প্যাট্রিক এনশিনদানু এই দলে রয়েছেন।
পর্যবেক্ষক দলকে সহায়তা করবে কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েটের একটি বিশেষ দল, যার নেতৃত্ব দেবেন ইলেক্টোরাল সাপোর্ট সেকশনের প্রধান ও উপদেষ্টা লিনফোর্ড অ্যাপরুজ। তারা মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম সমন্বয় ও বিশ্লেষণ সহায়তা প্রদান করবেন।
কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দলের ম্যান্ডেট অনুযায়ী, তারা নির্বাচনী পরিবেশ, ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া, গণভোটের আয়োজন, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, ভোটার অংশগ্রহণ এবং সামগ্রিক স্বচ্ছতা মূল্যায়ন করবেন। নির্বাচন ও গণভোট আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে কি না—সে বিষয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নই হবে তাদের মূল লক্ষ্য।
মিশন শেষে পর্যবেক্ষক দল তাদের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশসম্বলিত একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন কমনওয়েলথ মহাসচিবের কাছে জমা দেবে। পরবর্তীতে সেই প্রতিবেদন বাংলাদেশ সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দলসমূহ, কমনওয়েলথভুক্ত সব রাষ্ট্র এবং সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হবে।
আসন্ন নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নজরদারি যখন তুঙ্গে, তখন কমনওয়েলথের এই পর্যবেক্ষক দলের উপস্থিতি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এর গ্রহণযোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।