সম্পাদকীয়: আজ ১৪ ডিসেম্বর—শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি শোক, শ্রদ্ধা ও আত্মজিজ্ঞাসার এক গভীর দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে পরাজয় নিশ্চিত জেনে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছিল দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, লেখক, গবেষক ও চিন্তাবিদদের। লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট: স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া একটি জাতিকে মেধাশূন্য করে ফেলা, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের চিন্তা ও নেতৃত্বকে নির্মমভাবে ধ্বংস করা।
বুদ্ধিজীবীরা কোনো রাষ্ট্রের অলংকার নন; তাঁরা তার বিবেক, দিকনির্দেশক ও আলোকবর্তিকা। মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে যাদের হত্যা করা হয়েছিল, তাঁরা সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে মানবিকতা, জ্ঞান ও মুক্তচিন্তার প্রতীক ছিলেন। তাঁদের রক্তে রঞ্জিত রায়েরবাজার ও মিরপুরের বধ্যভূমি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা কেবল ভূখণ্ডের নয়, চিন্তারও।
শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ছিল নিছক প্রতিহিংসা নয়; এটি ছিল একটি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। সেই ষড়যন্ত্রের সহযোগীরা ইতিহাসে চিহ্নিত হলেও জাতি হিসেবে আমাদের ব্যর্থতা হলো—সব সময় সেই চেতনার ধারাবাহিক রক্ষণাবেক্ষণ করতে না পারা। বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ মানে শুধু পুষ্পস্তবক অর্পণ নয়; তাঁদের আদর্শ, সততা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে প্রতিষ্ঠা করাই এর প্রকৃত অর্থ।
আজকের বাংলাদেশে যখন মতপ্রকাশ, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ নানা চাপে পড়ছে, তখন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগ আমাদের আরও বেশি করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। আমরা কি তাঁদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পেরেছি? ন্যায়বিচার, সত্যনিষ্ঠা ও বিবেকের স্বাধীনতা কি যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে পেরেছি?
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও নৈতিক সাহস ছাড়া কোনো জাতি টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না। এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকা, মুক্তচিন্তার চর্চা অব্যাহত রাখা এবং মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়া।
শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের পথ দেখাক—অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, অবিচার থেকে ন্যায়ের দিকে, নীরবতা থেকে সত্যের উচ্চারণে।