সম্পাদকীয় :বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের মূল উৎস মুক্তিযুদ্ধ। যে সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, সেই ইতিহাস কেবল অতীতের স্মৃতি নয়—এটি এই দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণের নৈতিক ভিত্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনীতির চর্চায় দেখা যাচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে নানা সময়ে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার, বিকৃতি কিংবা উপেক্ষা করার প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলে সমাজে বিভাজন গভীরতর হচ্ছে এবং তরুণ প্রজন্ম বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ছে।
রাজনীতিতে মতবিরোধ থাকবে, এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু যখন ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়, কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাষ্ট্রবিরোধী তকমা লাগানো হয়, তখন তা গণতান্ত্রিক পরিসরকে সংকুচিত করে। মুক্তিযুদ্ধের মতো সর্বজনস্বীকৃত সত্যকে দলীয় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য অস্থিতিশীলতা বয়ে আনতে পারে।
এটি আরও উদ্বেগজনক যে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ—গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাম্য ও ন্যায়—রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। নির্বাচনী প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি সম্মান ও জবাবদিহির সংস্কৃতি—এসব ক্ষেত্রেই ঘাটতি স্পষ্ট। দেশের জনগণ চায় এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোনো দলের একচেটিয়া সম্পত্তি হবে না, বরং এটি হবে সকল নাগরিকের যৌথ মূল্যবোধ।
তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান—মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দলীয় বিরোধের উপাদান হিসেবে নয়, বরং জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে ধারণ করতে হবে। গণতন্ত্রের চর্চা বাড়াতে, ভিন্নমতের নিরাপদ জায়গা তৈরি করতে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানানো এবং তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।
দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কীভাবে আমাদের অতীতকে দেখি ও ব্যবহার করি তার উপর। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকার; এই অহংকারের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে রাজনীতিতে দায়িত্বশীলতা, সংযম ও সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা অপরিহার্য। ইতিহাসের আলোয় দাঁড়িয়ে আজকের রাজনীতি যদি উদারতা ও ন্যায়নিষ্ঠতার পথে ফিরে আসতে পারে, তবেই স্বাধীনতার আসল লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হবে।