সম্পাদকীয়:বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত যতই গভীরে অনুসন্ধান করা হোক না কেন, একটি সত্য বারবার সামনে এসে দাঁড়ায়—প্রবাসী বাংলাদেশিরা এই অর্থনীতির নীরব অথচ নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ। প্রবাস থেকে পাঠানো রেমিটেন্স শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করে না, এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, গ্রামীণ জীবন, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতায়ও প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়, এই অবদানের স্বীকৃতি ও প্রাপ্য সুবিধা কি তারা যথাযথভাবে পাচ্ছেন?
দশকের পর দশক ধরে লাখো প্রবাসী শ্রমিক কঠিন পরিশ্রম, ঝুঁকি ও বিচ্ছিন্নতার জীবন বেছে নিয়ে বিদেশে কাজ করে যাচ্ছেন। পরিবার-পরিজন ছেড়ে, অনেক ক্ষেত্রে অমানবিক কর্মপরিবেশ ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে রেমিটেন্স পাঠিয়ে যাচ্ছেন দেশে। এই অর্থেই টিকে থাকে অসংখ্য পরিবার, সচল থাকে গ্রামীণ অর্থনীতি এবং শক্ত ভিত পায় জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা। অথচ বাস্তবতা হলো—দেশে ফিরে এসব ‘রেমিটেন্স যোদ্ধা’ অনেক সময়ই নিজেদের অবদান অস্বীকৃত ও অবমূল্যায়িত মনে করেন।
পরিসংখ্যান বলছে, রেমিটেন্স বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক আয়ের উৎস। রপ্তানি আয় বা বৈদেশিক বিনিয়োগে যখন ধাক্কা আসে, তখন প্রবাসীদের পাঠানো অর্থই অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখে। সংকটকালে এই অবদান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই অবদানকে এখনও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সুবিধার মাধ্যমে সম্মান জানানো হয়নি।
রেমিটেন্স যোদ্ধাদের জন্য বিশেষ সুবিধা এখন আর কোনো আবেগী দাবি নয়, এটি একটি বাস্তব ও যৌক্তিক প্রয়োজন। সহজ ব্যাংকিং সেবা, কম খরচে ও দ্রুত রেমিটেন্স পাঠানোর সুযোগ, প্রবাসী ও তাদের পরিবারের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি—এসব উদ্যোগ সময়ের দাবি। পাশাপাশি দেশে ফিরে আসা প্রবাসীদের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, দক্ষতা স্বীকৃতি এবং পুনর্বাসন কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক মর্যাদা। প্রবাসীরা যেন কেবল বৈদেশিক মুদ্রার উৎস হিসেবে বিবেচিত না হন, বরং জাতি গঠনের অংশীদার হিসেবে সম্মান পান—এই মানসিক পরিবর্তন রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়কেই করতে হবে। ‘রেমিটেন্স যোদ্ধা’ শব্দটি যেন কেবল আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বাস্তব নীতিনির্ধারণেও তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
নীতিনির্ধারকদের কাছে এখন প্রশ্ন একটাই—যারা দেশের অর্থনীতিকে অক্সিজেন জোগাচ্ছেন, তাদের জন্য রাষ্ট্র কী পরিমাণ প্রস্তুত? প্রবাসীদের অবদান স্বীকার করে কার্যকর সুবিধা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা শুধু কৃতজ্ঞতার প্রকাশ নয়, এটি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিনিয়োগ।
রেমিটেন্স যোদ্ধারা মুখে কথা বলেন না, তারা কথা বলেন ঘামে ভেজা পরিশ্রম আর পাঠানো টাকার মাধ্যমে। এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের সেই নীরব ত্যাগের জবাব দেওয়ার—সম্মান, সুবিধা ও নিরাপত্তার মাধ্যমে।