ছবি: ইন্টারনেট।
লুটের অস্ত্র আর জেল পালানো বন্দীদের দাপটে দিশেহারা বাংলাদেশ। নির্বাচন এগিয়ে এলেও আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। অনেকেরই আশঙ্কা, নির্বাচন বানচাল করতেই বাড়ছে খুন-সন্ত্রাস। জঙ্গিবাদীরা সংখ্যালঘুদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। এমনকী, র্যাবের কর্মকর্তারাও সশস্ত্র দুষ্কৃতীদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামলে খুন-সন্ত্রাস, চুরি-ডাকাতি এখন নিত্যদিনের ঘটনা। সবচেয়ে বিপদে সংখ্যালঘুরা। সরকারি হিসাবেই ২০২৫ সালে সংখ্যালঘুদের ওপর ৬৪৫টি হামলা হয়েছে।
এক সময় র্যাবের নাম শুনলেই কট্টর জঙ্গিবাদী থেকে শুরু করে দারী অপরাধীরা পালিয়ে বেড়াতো। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় অভিযানকালে সন্ত্রাসীদের গুলিতে র্যাবের কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন প্রাণ হারালেন। সেইসঙ্গে দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে র্যাবের আরও তিন সদস্যকে জিম্মি করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর অবশ্য র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) এ কে এম শহিদুর রহমান হুঁশিয়ারি দিতে কার্পণ্য করেননি। নিহত মোতালেবের জানাজায় তিনি বলেছেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের আস্তানা একেবারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। এতে যত দিন দরকার, তত দিন সময় নেব।’ প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমও হুমকি দিতে ছাড়ছেন না। তিনি বলেছেন, ‘কম্বাইন্ড অপারেশন’ চালানো হবে। কিন্তু হুমকি-ধমকিই হচ্ছে। জঙ্গীদের বিরুদ্ধে কাজের কাজ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেখা যায়নি। সাধারণ মানুষের তাই আস্থা তলানিতে ঠেকেছে। বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসী আর অপরাধীদের প্রাণকেন্দ্র। প্রতিদিনই বাড়ছে হিংসা।
২০ জানুয়ারি যশোরের চৌগাছা উপজেলার সলুয়া বাজারে এক দোকানিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তার পর সেই হামলাকারীকে আবার গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। মব সন্ত্রাস চলছেই। বন্ধের কোনও লক্ষণ নেই। এমন পরিবেশেই ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের নির্বাচন। এখন থেকেই বেড়ে গিয়েছে অস্ত্রের ঝলকানি। দিন যত এগিয়ে আসছে, ততোই বাড়ছে হিংসা। চারিদিকেই শুধু অশান্তির খবর। ১৯ জানুয়ারি রাতে মাগুরা সদর উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামে মাগুরা-১ আসনে গণফোরামের সংসদ সদস্য প্রার্থী মিজানুর রহমানের বাড়িতে ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে রাতভর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে উত্তপ্ত গোটা এলাকা। জামায়াতের ছত্রছায়ায় জঙ্গি ও সন্ত্রাসীরা চারিদিকে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করছে বলে অভিযোগ। মৌলবাদী ও জিহাদিরাও পরিস্থিতির ফায়দা নিতে মাদ্রাসাগুলিকে ব্যবহার করছে। এরই মধ্যে ২০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির একটি চা–বাগান থেকে দুটি বস্তা ভর্তি ৯টি দেশে তৈরি একনলা বন্দুক উদ্ধার করেছে পুলিশ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় পুলিশের লুট হওয়া সব অস্ত্র এখনও উদ্ধার করতে ব্যর্থ অন্তর্বর্তী সরকার। সেই লুটের অস্ত্রই আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বড় বাধা হয়ে উঠেছে। এছাড়াও রয়েছে জেল থেকে পলাতক জঙ্গি ও অপরাধীরা। ৫ ই আগস্টে পর দেখা গিয়েছে বিভিন্ন থানা থেকে ৫ হাজার ৭৫৩টি অস্ত্র লুট হয়েছে। গোলাবারুদ লুট হয়েছে ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮৩২টি। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে ৪ হাজার ৪১০টি বন্দুক। এখনও পর্যন্ত বন্দুক উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৩৫৩টি। গোলা-বারুদের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে তিন লাখ ৯৪ হাজার ৩৪৯টি। দেশের পাঁচ কারাগার থেকে খোয়া যাওয়া ২০ আগ্নেয়াস্ত্র (চায়নিজ রাইফেল ও শটগান) এখনও উদ্ধার হয়নি। বাংলাদেশে মোট ৭২১ বন্দি এখনও পলাতক। এ ছাড়াও ১১ জন শীর্ষস্থানীয় দুষ্কৃতী এবং ১৭৪ জন জঙ্গিকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জেল থেকে মুক্তি দেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তারাও এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র আর জেলছুট বন্দিরাই শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এখনও শান্তিতে নির্বাচন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘লুট হওয়া অস্ত্র যেভাবেই হোক নির্বাচনের আগেই উদ্ধার করতে হবে।’ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর প্রতিশ্রুতি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশের লুট হওয়া কোনো অস্ত্র ব্যবহার হবে না। তবে নির্বাচন কমিশনার (অব.) ব্রিগেডিয়ার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এবিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের পরে থানা থেকে লুট হওয়া ১৫ শতাংশ অস্ত্র এবং ৩০ শতাংশ গুলি এখনও উদ্ধার হয়নি। তবে এসব অস্ত্র উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যই এবারের সাধারণ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যথার্থই বলেছেন, ‘এই নির্বাচনে নির্ধারিত হবে দেশ লিবারেল ডেমোক্রেসির (উদার গণতন্ত্র) হাতে থাকবে, নাকি উগ্রপন্থী–রাষ্ট্রবিরোধীদের দখলে যাবে’। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হচ্ছে। তাই বিএনপিরই সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন,‘প্রতিদিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে এবং নানাভাবেই সরকারের ঢিলেঢালা ভাব দেখছি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক’।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্র চলছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। গণভোটে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের তরফেও একই অভিযোগ করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে উঠছে পক্ষপাতের অভিযোগ। অন্তর্বর্তী সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ।
আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর থেকেই গোটা দেশের আর্থিক পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়। জিনিসের দাম বাড়তে থাকে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা চলে যায় নাগালের বাইরে। জুলাই আন্দোলনের জেরে তলানিতে নামে পুলিশের মনোবল। এমনকী, সেনাবাহিনীর মনোবল ও শৃঙ্খলা নিয়েও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চলে ছিনিমিনি খেলা। তারই পরিনতিতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বাড়ছে অপরাধ। চুরি-ছিনতাইয়ের সঙ্গে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক সংঘর্ষ। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন যতো এগিয়ে আসছে ততোই বাড়ছে অশান্তির বহর। কারণ জঙ্গিবাদীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেইসঙ্গে নির্বাচন বানচাল করার ষড়যন্ত্রও চালিয়ে যাচ্ছে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি। ফলে গণতন্ত্রে উত্তরণ প্রক্রিয়াও জটিলতর হচ্ছে বাংলাদেশে।