বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক অনন্য, শক্তিশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী অধ্যায়ের নাম। তাঁর মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বশূন্যতা নয়; এটি স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশের ক্ষমতা, প্রতিরোধ ও আপসহীন রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ পর্বের অবসান।
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, দেশের প্রথম নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী নেত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া কেবল ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন না তিনি ছিলেন ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীকও। তাঁর রাজনৈতিক জীবন গড়ে উঠেছে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং ব্যক্তিগত ত্যাগের ধারাবাহিকতায়।
স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক- ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিপর্যস্ত বিএনপির হাল ধরেন বেগম খালেদা জিয়া। সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে তাঁর নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে আপসহীন আন্দোলন। বারবার গ্রেপ্তার, দমন-পীড়ন এবং রাজনৈতিক চাপে নতিস্বীকার না করে তিনি ‘এরশাদ হটাও’ আন্দোলনের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।
এই সংগ্রামেরই পরিণতি ১৯৯০ সালের স্বৈরশাসনের পতন এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। এই পর্যায়ে খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনীতিক নন, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
ক্ষমতায় থেকেও বিরোধিতার রাজনীতি-খালেদা জিয়ার রাজনীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ক্ষমতায় থেকেও তিনি আপসের রাজনীতি করেননি। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তাঁর শাসনামল যেমন সমর্থন পেয়েছে, তেমনি সমালোচনাও হয়েছে। তবে তাঁর নেতৃত্বে বহুদলীয় গণতন্ত্র, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বিচারব্যবস্থার সাংবিধানিক কাঠামো টিকে ছিল এ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা রয়েছে।
নির্বাচনী রাজনীতিতে তাঁর অনন্য রেকর্ড কখনো সংসদ নির্বাচনে পরাজিত না হওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল।
ওয়ান–ইলেভেন থেকে দীর্ঘ রাজনৈতিক অবরোধ: ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেপ্তার ও দীর্ঘ কারাবাস বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের এক কঠিন অধ্যায়। সে সময় বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তিনি দেশে থাকার সিদ্ধান্ত নেন যা তাঁর আপসহীন রাজনৈতিক অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ।
পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা, কারাবাস, ক্যান্টনমেন্টের বাসভবন থেকে উচ্ছেদ এবং দীর্ঘ চিকিৎসাজনিত অবরুদ্ধ জীবন তাঁকে রাজনীতির মাঠ থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তবুও তিনি রাজনৈতিকভাবে পরাজিত হননি সমর্থকদের চোখে তিনি হয়ে ওঠেন নিপীড়নের শিকার এক দৃঢ় নেত্রী।
নারী নেতৃত্বের এক ভিন্ন মাত্রা-বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্ব বলতে মূলত শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার দ্বন্দ্বকেই বোঝানো হয়। তবে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের ধরন ছিল ভিন্ন—তিনি ছিলেন আবেগনির্ভর নয়, বরং প্রতিরোধ ও অনমনীয়তার প্রতীক। তাঁর রাজনৈতিক ভাষা, আন্দোলনের কৌশল এবং ‘না’ বলার ক্ষমতা তাঁকে আলাদা করেছে।
উত্তরাধিকার ও শূন্যতা-বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু বিএনপির জন্য একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। দলটি এখন নেতৃত্ব, কৌশল এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। তাঁর অনুপস্থিতিতে বিএনপির রাজনীতিতে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা পূরণ করা সহজ হবে না।
কিন্তু ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া থেকে যাবেন এক আপসহীন নেত্রী হিসেবে যিনি কখনো হার মানেননি, কখনো নতিস্বীকার করেননি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর জীবন ছিল সংগ্রামের প্রতিশব্দ, আর মৃত্যু সেই সংগ্রামের এক নীরব কিন্তু গভীর সমাপ্তি।