বাংলাদেশের মানবাধিকার সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া তিনটি আইন—এমন দাবি করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির মতে, এসব আইনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নেওয়া কিছু সুরক্ষা ব্যবস্থা বাতিল অথবা সীমিত করা হয়েছে। এর ফলে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ অতীতের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধের সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ।
সংস্থাটি বলেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে (এনএইচআরসি) শক্তিশালী করতে দুটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। ওই অধ্যাদেশের আওতায় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত, গুম প্রতিরোধ এবং আটককেন্দ্র পরিদর্শনের মতো ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়। তবে সেপ্টেম্বরে পাস হওয়া নতুন এনএইচআরসি আইনে কমিশনের সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে এইচআরডব্লিউ।
নতুন আইনের বিধান অনুযায়ী, কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে প্রতিবেদন দিতে বলা যাবে। তবে প্রতিবেদন সন্তোষজনক না হলে অথবা প্রতিবেদন না দিলে কমিশন নিজস্ব তদন্ত করতে পারবে বলে আইনে উল্লেখ রয়েছে। এইচআরডব্লিউর দাবি, নতুন আইনে কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের প্রভাব বাড়ার পাশাপাশি কমিশনের বাজেট ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা সীমিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত আইন নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে সংস্থাটি। ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আইনে গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। তবে অভিযুক্ত বাহিনীকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো নিরাপত্তা সংস্থা অথবা আন্তঃসংস্থা তদন্ত দলের মাধ্যমে তদন্তের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সংস্থাটির মতে, আগের অধ্যাদেশে এনএইচআরসিকে আটককেন্দ্র, এমনকি গোপন আটককেন্দ্র থাকার সন্দেহ রয়েছে—এমন স্থানও পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। নতুন আইনে সেই ক্ষমতা রাখা হয়নি। এ ছাড়া গুমের ঘটনায় কমান্ড রেসপনসিবিলিটির আইনি মানদণ্ডেও পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে দাবি করেছে এইচআরডব্লিউ। আগের ব্যবস্থায় কোনো কর্মকর্তা লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতেন বা জানা উচিত ছিল এবং তা প্রতিরোধের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ব্যবস্থা নেননি—এমন পরিস্থিতিতে দায় নির্ধারণের সুযোগ ছিল। নতুন ব্যবস্থায় সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার প্রমাণ প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন আইন পাসের মাধ্যমে র্যাবের নাম পরিবর্তন করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) করা হয়েছে। এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন নামে বাহিনীটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সংস্থাটির দাবি, র্যাবের জনবল, ক্ষমতা, সম্পদ ও নথিপত্র নতুন বাহিনীতে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাহিনীর লোগোও অপরিবর্তিত রেখে শুধু ‘RAB’-এর পরিবর্তে ‘SRB’ লেখা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া বিষয়ক পরিচালক এলেইন পিয়ারসন বলেন, অতীতের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা খাতে প্রকৃত সংস্কার প্রয়োজন। পাশাপাশি নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থা থাকা জরুরি।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে এনএইচআরসি আইনকে মানবাধিকার সুরক্ষা জোরদারের উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে বলেছেন, নতুন আইনে কমিশনকে আরও কার্যকর ও স্বাধীন করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সূত্র: হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন ও প্রদত্ত তথ্য।