ছবি: ইন্টারনেট।
বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ, হত্যা, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং বিচারহীনতার ক্রমবর্ধমান ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়ে Bangladesh Child Protection Initiative-এর উদ্যোগে আজ বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে, মানিক মিয়া এভিনিউতে একটি নাগরিক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
“আর কত শিশু মরলে রাষ্ট্র জাগবে?” শিরোনামে আয়োজিত এই মানববন্ধনে শিশুদের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানানো হয়। আয়োজকরা বলেন, শিশুর ওপর সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভঙ্গুরতা, সামাজিক নীরবতা এবং বিচারহীনতার গভীর সংকটের প্রতিফলন।
অনুষ্ঠানে আহ্বায়ক আনন্দ কুটুম উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি নারীদের স্পেশাল পার্টস নিয়ে রাজনৈতিক স্লোগান দিতে এবং যারা এসব স্লোগান দিয়েছে তাদের অনেকেই এখন সংসদে। নারীদের অশ্লীল গালিগালাজ কখনো রাজনৈতিক স্লোগান হতে পারে না। এসকল কর্মকাণ্ড নারীর প্রতি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে যা অনেক অনেক উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক ভাবে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের উদাসীনতা আর মেনে নেওয়া যায় না। তিনি শিশু সুরক্ষায় জরুরি জাতীয় পদক্ষেপ, কার্যকর তদন্ত এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের দাবি জানান।
মানববন্ধনের সূচনা বক্তব্য দেন হো চি মিনহ, যেখানে তিনি বলেন, “শিশুর জীবন কোনো পরিসংখ্যান নয়, শিশুর কান্না কোনো ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়—এটি জাতির লজ্জা। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক, সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করতে হবে।”
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন সৈয়দা রাজিয়া সুলতানা, চেয়ারপারসন, মেমোরিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ম্যানেজমেন্ট কমিটি; মোরশেদ মিশু, কার্টুনিস্ট; মাহমুদুল হাসান শিবলী, প্রতিষ্ঠাতা, Youth Planet; আহসান ইমাম, শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; শেহজাদ আমান, সাংবাদিক ও লেখক; রাজিয়া রাজ্জাক, শিক্ষক, মণিপুরি হাই স্কুল; শাহ রাফায়েত চৌধুরী, প্রতিষ্ঠাতা, Footsteps; এবং জয়া শিকদার, মানবাধিকারকর্মী ও প্রতিষ্ঠাতা, সম্পূর্ণা।
বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বলেন, শিশুদের ওপর ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিচারব্যবস্থার সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। তাঁরা বলেন, শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের সামাজিক আপস, স্থানীয় সালিশ, রাজনৈতিক প্রভাব, অপরাধীকে আশ্রয় দেওয়া বা প্রশাসনিক উদাসীনতা গ্রহণযোগ্য নয়।
মানববন্ধন থেকে নিম্নলিখিত দাবি জানানো হয়:
১. শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
২. অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৩. আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা থাকলে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
৪. ভিকটিম শিশু ও পরিবারের জন্য চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. শিশুদের জন্য নিরাপদ ঘর, নিরাপদ স্কুল, নিরাপদ রাস্তা, নিরাপদ গণপরিবহন, নিরাপদ পাড়া-মহল্লা এবং নিরাপদ প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করতে হবে।
৬. শিশু সুরক্ষায় জাতীয় জরুরি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
৭. শিশু নির্যাতনের ঘটনায় স্থানীয় সালিশ, সামাজিক চাপ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অপরাধীকে রক্ষার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
বক্তারা আরও বলেন, শিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়—এটি অধিকার। শিশুর ন্যায়বিচার কোনো অনুরোধ নয়—এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বাংলাদেশে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং সভ্যতার কোনো দাবিই পূর্ণতা পায় না।
মানববন্ধনের শেষে আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই কর্মসূচি কেবল একটি দিনের প্রতিবাদ নয়; এটি শিশুদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের দাবিতে একটি চলমান নাগরিক অবস্থান। Bangladesh Child Protection Initiative শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, বিচারহীনতা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে কাজ চালিয়ে যাবে।
শিশুর জীবন অমূল্য।
শিশুর নিরাপত্তা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
শিশুর ন্যায়বিচার জাতির দাবি।
Children’s Lives Matter. Justice, Protection and Accountability Now.