আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগের পরপরই গা-ঢাকা দিয়েছেন তার সারাদেশের নেতাকর্মীরা। তেমনি যশোরের আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি, নেতাকর্মী ও ক্যাডাররাও অনেকে যশোর ছেড়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন বাহিরের জেলাতে। বিশেষ করে বিগত সময়ে জুলুমকারী অনেক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এখন যশোরের বাহিরে। কোন মাধ্যমেই খোঁজ মিলছে না তাদের।
অপরদিকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশ ত্যাগের পর পুলিশ বাহিনীর অনান্য ডিপার্টমেন্টের মতো যশোরের ট্রাফিক পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ কর্মবিরতিতে চলে যায়। এরপর থেকে যশোর শহরের অভ্যান্তরীন সড়ক ও মহাসড়কগুলোতে বন্ধ হয়েছে চাঁদাবাজি। এসকল সড়কে চালচলকারী বিভিন্ন চালকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে গত ৫ আগস্টের পর থেকে যশোরের সড়ক ও মহাসড়কে চাঁদাবাজি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের এবং ট্রাফিক পুলিশ বিভাগের চাঁদাবাজির সিন্ডিকেটের ব্যাপারে মুখ খুলতো না যানবাহন চালকেরা। তবে বর্তমান সময়ে যশোরের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও ট্রাফিক পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ মাঠে না থাকায় জিগাসা করা মাত্র জুলুমের বর্নণা দিচ্ছেন ভুক্তভোগী যানবাহন চালকেরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত সময়ে যশোর শহরের পালাবাড়ি মোড়, চাচড়া চেকপোস্ট মোড়, মনিহার মোড়, নিউমার্কেট ও দড়াটানা ও বকুলতলায় ইজিবাইক ও রিকশার অবৈধ পার্কিং জোন বানিয়েছিল ওই সকল এলাকার স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগের নেতা ও তাদের ক্যাডারবাহিনী। এ সকল পয়েন্ট থেকে ইজিবাইক ও রিকশা চালকদের কাছ থেকে যানবাহন বা ট্রিপ প্রতি (প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়) সিরিয়াল অনুযায়ী ২০, ৩০ ও ৫০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা তোলা হতো। এসকল চাঁদার টাকার সম্পূর্ণ অংশ যেত আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের পকেটে। প্রশাসনের মুখ বন্ধ করতে একটি অংশ যেত যশোরের ট্রাফিক পুলিশ বিভাগের সেসময়ে দায়িত্বে থাকা উর্ধতন কর্মকর্তাদের পকেটে।
অপরদিকে যশোর ট্রাফিক পুলিশ বিভাগ নিরবে গোপনে দৈনিক ও মাসিক হারে ইজিবাইক চালকদের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করতো বলেও একাধিক বিশ্বস্ত সুত্র জানিয়েছে। আর এ চাঁদাবাজির কাজে ব্যবাহার করা হতো কমিউনিটি পুলিশ সদস্যদের। হাতে লাঠি নিয়ে কমিউনিটি পুলিশের সদস্যরা ট্রাফিক পুলিশকে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করার আড়ালে ইজিবাইক ও রিকশাচালকদের গাড়িতে এবং তাদের শরীরে আঘাত করে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজি করতো।
শহরের রেলগেট এলাকার রিকশাচালক তোতা মিয়া বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে শহরের মধ্যে রিকশা নিয়ে বের হলে কমিউনিটি পুলিশের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় দাড় করিয়ে গোপনে চাঁদা নিত। আমরা প্রতিবাদ করলে বা চাদাঁ দিতে রাজি না হলে আমাদের রিকশার চাবি কেড়ে নিতো নতুবা রিকশা তুলে নিয়ে ট্রাফিক অফিসে নিয়ে যেত। তবে গত ৫ আগস্ট থেকে কোথাও কোন চাঁদা দেওয়া লাগছে না।’
কাজীপাড়ার আরেক ইজিবাইক চালক রিয়াজ হোসেন বলেন, ‘এখন আর কোথাও চাঁদা দেওয়া লাগছে না। চাঁদা তুলতো আওয়ামী লীগের নেতাদের ক্যাডাররা। নেতারা পালিয়েছে সাথে চাঁদাবাজগুলোও পালিয়েছে। সড়কে আমরা এখন একটু স্বস্তিতে গাড়ি চালাচ্ছি।’
পালবাড়ি মোড়ে কথা হয় ইজিবাইক চালক সাইফুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, ‘ভাড়ার ইজিবাইক চালাই। প্রতিদিন ৭০০-৮০০ টাকা আর হলে, মালিককে দিতে হয় ৪০০ টাকা। আর বিভিন্ন জায়গায় চাঁদা দিতে হয় প্রায় ২০০ টাকার বেশি। তাহলে অবশিষ্ট টাকা দিয়ে কিভাবে চলবো? এখন আমরা স্বাধীন। ছাত্ররা সড়ক নিয়ন্ত্রণ করছে, কোন চাঁদাবাজিও নেই শহরে।’
অপরদিকে একইভাবে নিরব চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে নাভারণ হাইওয়ে পুলিশ ও নওয়াপাড়া হাইওয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে। ঝিকরগাছা থেকে শার্শা অভিমুখী মহাসড়কে চলাচলকারী একাধিক ইজিবাইক চালকরা জানান, সড়কে ইজিবাইক চলার আইন না থাকলেও পেটের দায়ে আমাদের চালাতে হয়। আর সড়কে ইজিবাইক চালাতে গেলে নাভারণ হাইওয়ে পুলিশকে স্লিপ আবার কখনো বিনা স্লিপে চাঁদা দিয়ে ইজিবাইক চালাতে হতো। শুধু তাই নয় বিভিন্ন সময়ে চেকপোস্টের নামে বিভিন্ন যানবাহন থেকে চাঁদাবাজি করতো হাইওয়ে পুলিশ। গত ৫ আগস্টের পর থেকে এই সড়কেও চাঁদাবাজি বন্ধ রয়েছে। একইভাবে যশোর-খুলনা মহাসড়কের বসুন্দিয়া থেকে নওয়াপাড়া রুটে চলাচলকারী ইজিবাইক চালকদেরও চাঁদা দেওয়া লাগতো নওয়াপাড়া হাইওয়ে পুলিশকে। চেকপোস্ট বসানো হতো শুধু মাত্র ইজিবাইক ও মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে। সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের লাইসেন্স দেখার কর্মযঙ্গ খুবই কম ছিল।
শিমুলিয়া এলাকার ইজিবাইক চালক শিপন সরকার বলেন, ‘আমাকে চাঁদা না দেওয়ায় নাভারণ হাইওয়ে পুলিশ মাস দুই আগে আমাকে একটি মামলা দেয়। আমার ইজিবাইক জব্দ করে। পরবর্তীতে টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনতে হয়েছে।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে গত ৫ই আগস্ট থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তিনদিন যশোর শহরের সড়ক ও মহাসড়কগুলোতে এ চাঁদাবাজি বন্ধ রয়েছে। দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সাথে সাথে এ সকল চাঁদাবাজির সাথে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনাসহ পুনরায় যাতে চাঁদাবাজি না করতে পারে এজন্য পরবর্তী সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী যানবাহন চালকেরা।