রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তরবর্তী সরকারের গঠন করা কমিশনের মৌলিক সুপারিশের সঙ্গে একমত হয়নি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
বরং রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে কয়েক বছর আগে জাতির সামনে উত্থাপন করা নিজেদের ৩১ দফা প্রস্তাবের বিষয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে বৃহত্তম এ দলটি।
সংস্কার নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে প্রথম পর্যায়ে তিন দিন বৈঠকের শেষদিন গতকাল মঙ্গলবার আবারো দলীয় অবস্থান স্পষ্ট করেছে বিএনপি।
অন্তরবর্তী সরকারের সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে গঠন করা হয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
মঙ্গলবার শেষদিনের বৈঠকে ‘প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে’ এমন সুপারিশে একমত হয়নি বিএনপি। জাতীয় নির্বাচনের ভোটের অনুপাতে সংসদের উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমাতে জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠনেও রাজি হয়নি তারা।
যদিও প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এ দুই সুপারিশকেই ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিতের প্রধান চাবিকাঠি আখ্যা দিয়েছে। যেসব সুপারিশে দলটি একমত হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে পরবর্তী সংসদে বিশদ আলোচনার প্রয়োজন বলেও মতামত দিয়েছে বিএনপি।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের নজির থাকলেও বিএনপি আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম তিন বিচারপতির মধ্য থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগসহ বিভিন্ন প্রস্তাব করেছে মঙ্গলবারের বৈঠকে।
বিএনপি ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষ ও এনসিসি গঠনে রাজি না হওয়ায় কমিশন সদস্যরা হতাশা জানিয়েছেন বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে। বৈঠকে তারা বিএনপি নেতাদের বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ব্যর্থ হবে যদি সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করা না যায়। হাজারের বেশি মানুষের আত্মত্যাগ ব্যর্থ হবে।
জবাবে বিএনপি নেতারা বলেছেন, অতীতের স্বৈরাচারের সঙ্গে তুলনা করলে ভুল হবে। বিএনপি গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করবে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও নির্বাহী বিভাগের হাতে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা থাকতে হবে।
মঙ্গলবার বেলা ১১টায় সংসদ ভবনে ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের সভাপতিত্বে বিএনপির সঙ্গে বৈঠক শুরু হয়। মধ্যাহ্ন বিরতি দিয়ে তা চলে সন্ধ্যা পৌনে ৭টা পর্যন্ত। এর আগে ১৭ ও ২০ এপ্রিলও ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে দিনব্যাপী বৈঠক করেছিল বিএনপি। আগের দুই দিন সংবিধান সংস্কারের ৭০ সুপারিশের ৬২টি এবং বিচার বিভাগ সংস্কারের তিন সুপারিশ নিয়ে আলোচনা হয়।
গতকাল সংবিধানের বিচার বিভাগ-সংক্রান্ত সুপারিশ নিয়ে আলোচনা হয় বৈঠকের প্রথম পর্বে। দ্বিতীয় পর্বে জনপ্রশাসন, দুদক এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়।
বিএনপির প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। আরো ছিলেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, রুহুল কুদ্দুস কাজল ও আবু মো. মনিরুজ্জামান খান।
বৈঠক শেষে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক পথ খোলা আছে। কমিশন সময় নির্ধারণ করে আমন্ত্রণ জানালে বিএনপি আরো আলোচনার জন্য প্রস্তুত। বিএনপিই প্রথম দল, যারা সংস্কারের কথা বলেছে। বিএনপি সংস্কার চায়। সংস্কারে সহযোগিতা করছে।
সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ ছাড়াও বৈঠকে ছিলেন কমিশন সদস্য বদিউল আলম মজুমদার, ইফতেখারুজ্জামান, বিচারপতি এমদাদুল হক ও সফর রাজ হোসেন।