অ্যান্টার্কটিকার বিপজ্জনক ‘থোয়াইটস হিমবাহ’ বিজ্ঞানীদের পূর্বানুমানের চেয়েও অনেক দ্রুত গতিতে গলছে। নতুন এক জলবায়ু গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, হিমবাহটির বরফ অভূতপূর্ব হারে গলার কারণে ২১০০ সাল নাগাদ বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৩০ মিলিমিটার বা প্রায় ১ দশমিক ২ ইঞ্চি পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এটি আগের পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। গবেষকরা জানিয়েছেন, নতুন করে বৈশ্বিক উষ্ণতা আর না বাড়লেও এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব নাও হতে পারে।
‘ডুমসডে গ্লেসিয়ার’ বা ‘কেয়ামতের হিমবাহ’ নামে পরিচিত এই দানবীয় হিমবাহটি পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকায় অবস্থিত। প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই হিমবাহটির আয়তন আফ্রিকার দেশ সেনেগালের সমান এবং এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের চেয়েও বড়। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির গবেষকেরা নতুন কম্পিউটার মডেলিংয়ের মাধ্যমে বরফ গলার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পেয়েছেন। তাঁদের যৌথ গবেষণাটি বিখ্যাত ‘নেচার কমিউনিকেশনস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
থোয়াইটস কেবল নিজেই একটি বিশাল হিমবাহ নয়, এটি পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার আরও বড় বরফস্তরকে স্থিতিশীল রাখতে প্রাকৃতিক বাঁধ হিসেবে কাজ করে। পাইন আইল্যান্ডসহ আশপাশের হিমবাহগুলোর সাথে মিলে এটি বৃহত্তর বরফস্তরের সুরক্ষা দেয়। ফলে থোয়াইটস দুর্বল হয়ে ভেঙে পড়লে পুরো অঞ্চলের বরফস্তর ধসে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হবে, যার পরিণতিতে বিশ্বের নিচু উপকূলীয় শহরগুলো স্থায়ী প্লাবনের মুখে পড়তে পারে। যদিও গবেষকরা বলছেন, এই মহাবিপর্যয় কয়েক দশক বা কয়েক শতাব্দীর আগে নিশ্চিতভাবে ঘটবে কি না, তা নিয়ে আরও বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের সামগ্রিক উচ্চতা বৃদ্ধির প্রায় ৪ শতাংশের জন্যই দায়ী এই থোয়াইটস হিমবাহ। ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত হিমবাহটি এক লাখ কোটি টনেরও বেশি বরফ হারিয়েছে এবং প্রতিবছর এতে যুক্ত হচ্ছে আরও গড়ে প্রায় ৫ হাজার কোটি টন বরফ ক্ষয়ের ক্ষতি।
গবেষণায় দেখা গেছে, কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই উষ্ণ সামুদ্রিক পানি হিমবাহের নিচের অংশে প্রবেশ করে এর পুরুত্ব কমিয়ে ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ২০১৯ সালে নাসার গবেষণায় হিমবাহটির নিচে ম্যানহাটনের দুই-তৃতীয়াংশের সমান বিশাল এক জলজ গহ্বরের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। নতুন কম্পিউটার মডেলে দেখা গেছে, জোয়ার-ভাটার কারণে ভাসমান বরফস্তর ওঠানামা করার সময় উষ্ণ পানি আরও গভীরে ঢুকে পড়ে বরফ গলা তরান্বিত করছে। এদিকে ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের আরেকটি গবেষণা জানিয়েছে, সমুদ্রের পানি কোনোভাবে ঠান্ডা হলেও এই বরফ গলার ধারা অন্তত আরও ১৫০ বছর ধরে অব্যাহত থাকতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা ও বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশনস