ঢাকা অফিস: দেশে-বিদেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন নাহার রুনি হত্যার নতুন তথ্য মিলেছে। ঘটনার রাতে কিলিং মিশনে সরাসরি অংশ নেন মাত্র দু’জন।
তবে ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টে অস্পষ্টতার কারণে দুই খুনীকে সরাসরি সনাক্ত করা যাচ্ছে না। এ মামলার তদন্তে গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
টাস্কফোর্স সম্প্রতি হাইকোর্টে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। আলোচিত মামলাটির তদন্তে আরো সময়ের দরকার বলে আদালতকে জানিয়েছে টাস্কফোর্স।
উচ্চ আদালতে জমা দেয়া প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, টাস্কফোর্স তাদের তদন্তে সাগর-রুনির দাম্পত্যকলহ, চুরি বা পেশাগত কারণে খুনের তথ্য পায়নি। ভিসেরা রিপোর্টেও চেতনানাশক বা বিষজাতীয় কিছু পাওয়া যায়নি। রান্নাঘরে থাকা ছুরি ও বটি দিয়ে হত্যা করা হয় তাদের। ক্ষত নিয়েও অনেকক্ষণ জীবিত ছিলেন তারা। আগে থেকে বাসায় কেউ ছিল না, আর জোর করেও কেউ প্রবেশ করেনি।
প্রসঙ্গত, হাইকোর্ট ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এক আদেশে সাগর-রুনি হত্যার তদন্তের দায়িত্ব র্যাবের কাছ থেকে সরিয়ে বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিজ্ঞকর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি নতুন টাস্কফোর্সের কাছে হস্তান্তরের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বলেন।
র্যাব ২০১২ সালে মামলাটির দায়িত্ব নেওয়ার পর বছরের পর বছর ধরে তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত এমন নির্দেশনা দেন। এরপর গঠিত টাস্কফোর্সকে চলতি বছরের ৩১ মার্চের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দিলেও এখনো তদন্ত শেষ করতে পারেনি তারা। এখন পর্যন্ত নতুন করে সাত সাংবাদিকসহ ১২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে টাস্কফোর্স।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাত ৩টা থেকে ৫টার মধ্যে খুন হন সাগর-রুনি। ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট পর্যালোচনা করে বুঝা যায়, প্রথমে সাগর ও পরে রুনিকে ছুরিকাঘাত করা হয়। হত্যার আগে সন্তান মেঘকে নিয়ে একই খাটে ঘুমিয়েছিলেন।
উচ্চ আদালতে দেয়া টাস্কফোসের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, হত্যায় সাগর বাধা দিতে পারেন- এমন ধারণায় তার হাত-পা বাঁধা হয়। রুনি নারী হিসেবে দুর্বল চিন্তা করে তার হাত-পা বাঁধার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়নি। ‘ব্লাড প্যাটার্ন’ পর্যবেক্ষণ করে ধারণা করা হয়, আগে মারা গেছেন রুনি। আর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করে সমীকরণ মিলিয়ে টাস্কফোর্স বলছে, সাগরের মৃত্যু হয়েছে পরে।
ঘটনাস্থলে চারজনের ডিএনএ পাওয়া যায়। এর মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী। যাদের মধ্যে দুজন সাগর-রুনি, তবে অন্য দুজনের ডিএনএ কোনোভাবেই সনাক্ত করতে পারেনি টাস্কফোর্স। তাই হত্যার মোটিভ ও খুনে কারা জড়িত সে বিষয়টিও এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট করা যায়নি। এই যুক্তি দেখিয়ে তদন্তে আরো সময় চেয়েছে টাস্কেফোর্স।
টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সেদিন (হত্যার রাতের পরদিন সকাল) গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে। এর আগে গণমাধ্যমকর্মী ও স্থানীয়দের পায়ের ছাপে ধ্বংস হয়ে যায় অনেক আলামত।
তবে রান্না ঘরের বারান্দা সাড়ে ১৪ ইঞ্চি ও সাড়ে ৮ ইঞ্চির ভাঙা অংশটি সম্পূর্ণ নতুন ছিল। তা দিয়ে সহজে মানুষ ঢুকতে ও বের হতে পারে। যদিও সেখানকার পূর্ণাঙ্গ ফুটপ্রিন্ট পাওয়া যায়নি।
এদিকে সিআইডির সঙ্গে ডিএনএ বিশ্লেষণ করে টাস্কফোর্স জানায়, একসঙ্গে দুই বা তিনজনের ডিএনএ থাকলে শনাক্ত করা সম্ভব। সংখ্যায় এর বেশি হলে শনাক্ত করা কঠিন। নমুনায় ৫ থেকে ৬ জনের ডিএনএ থাকায় তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন দাখিলের পর মামলার তদন্তে আরো ছয় মাস সময় দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজীর হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আরশাদুর রউফ। রিটের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী শিশির মনির।
গত বছরের ২৩ অক্টোবর হাইকোর্টের নির্দেশে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার ঘটনায় করা মামলার তদন্তে পিবিআই প্রধানকে আহ্বায়ক করে ৪ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।
কমিটিতে পুলিশের অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার নিচে নয়- এমন একজন প্রতিনিধি, সিআইডির একজন প্রতিনিধি ও র্যাবের একজন প্রতিনিধিকে রাখা হয়েছে।
গত বছরের ১৭ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে টাস্কফোর্স গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তার আগে গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার ঘটনায় করা মামলার তদন্তে উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। তাদেরকে ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে বলা হয়।
একইসঙ্গে মামলার তদন্ত থেকে র্যাবকে সরিয়ে দেয়ার আদেশ দেন আদালত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। বিভিন্ন বাহিনীর অভিজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তাদের নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করতে বলা হয়।
উল্লেখ্য, মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন নাহার রুনি রাজধানী ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে তাদের ভাড়া বাসায় ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে খুন হন। আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের পর রুনির ভাই নওশের আলম বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন।