জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন থেকে ঝিনাইদহতে বদলীর আগেই আমার জানা ছিল যে বাংলাদেশে আত্মহত্যার রাজধানী হিসেবে এই জেলা পরিচিত। কিন্তু ঝিনাইদহ সদর সার্কেল হিসেবে কাজ করতে গিয়ে এই জেলা ও বিশেষ করে শৈলকুপা উপজেলায় এর চরম ভয়াবহতা অনুভব করতে পারি। এমন কোন দিন নেই যেই দিনে আমার অপমৃত্যু মামলার পিও (প্লেস অফ অকারেন্স) ভিজিট করতে হয় না। জেলাটিতে ২০১০ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৩১৫২ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। এই সময়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন ২২ হাজার ৬৭৫ জন। গত ৫ বছরের তথ্য বিবেচনায় নারীদের আত্মহত্যার সংখ্যা বেশি। কিন্তু করোনাকালে বেড়ে গিয়েছিল পুরুষদের আত্মহত্যার হার।
জেলা পুলিশের ডিএসবি রিপোর্টের তথ্য বলছে, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পুরুষদের আত্মহত্যার হার ৪৩ থেকে ৪৪ ভাগ থাকলেও করোনাকালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৪৭ ভাগের বেশি। বর্তমানে নারী আত্মহত্যার হার আবারো বাড়ছে।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় আমার একটি কোর্স ছিল রিসার্চ মেথডোলজি। পেশাগত তুমুল ব্যস্ততার কারণে এপিএ এবং এমএলএ ফরম্যাটে গবেষণা সম্ভবপর না হলেও অনুসন্ধিৎস মন থেমে থাকবে কেন? ঝিনাইদহতে বয়স অনুযায়ী যদি আমরা আত্মহত্যার হার পর্যালোচনা করি তাহলে চিত্রটা অনেকটা এরকম দাঁড়াবে- ১২-৩০ বছর = ৪৫%, ৩১-৫০ বছর = ২৫%, ৫১-৭০ বছর = ২০%, অন্যান্য = ১০%। আত্মহত্যার ধরণ = প্রধানত বিষ/ কীটনাশক পান ও গলায় ফাঁস।
সুতরাং, বয়সন্ধিকালীন সময় থেকে পূর্ণ যুবক/ যুবতী বয়সের সময়টাতে আত্মহত্যার হারটা তুলনামূলক ভাবে বেশি। যদি সামগ্রিকভাবে ঝিনাইদহের এই আত্মহত্যার অতি ভয়াবহ চিত্রের কারণগুলো আমরা বের করতে চাই তাহলে দেখতে পাব-
১. দক্ষিণ অঞ্চলের জেলাগুলোর মধ্যে ঝিনাইদহে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অনেক কম, এমনকি সিডর বা আইলাতেও তেমন ক্ষতি হয়নি এই জেলার। এ এলাকার মানুষ বড় কোন প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগের সম্মুখীন হয়নি। এর মানে হচ্ছে এখানে জীবনের জটিলতা কম। যে কারণে মানুষ অনেক বেশি আবেগপ্রবণ এবং আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ কম।
২. বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার মত এখানেও অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেবার প্রবণতা লক্ষনীয়। ফলে তারা অল্প বয়সেই একটা বড় মানসিক ও শারীরিক চাপের মুখে পড়ে যায় । এর সাথে জামাই বা শ্বশুরবাড়ির অত্যাচার যুক্ত হলে ঝিনাইদহের আবেগপ্রবণ মেয়েরা দ্রুত আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
৩. বয়সন্ধিকালে ছেলে বা মেয়েদের হরমোন ইমব্যালেন্স ঘটে থাকে। যার ফলে তাদের মন থাকে দূর্বল। অনেক সময় বাবা-মা’র সামান্য বকাবকিতে আবেগে আক্রান্ত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে থাকে।
৪. ঝিনাইদহতে প্রকৃতিগত ভাবে লড়াকু মানসিকতার কিছুটা ঘাটতি থাকায় আয়-রোজগার না থাকলে, জটিল অসুখ হলে অথবা হতাশা ও মানসিক অস্থিরতা থেকে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে যায়।
৫. ঝিনাইদহ এলাকার এ ভয়াবহ চিত্রের পেছনে ভৌগলিক, জলবায়ুগত, জেনেটিক, অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক কারণ কোনটি প্ৰধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে সেটি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণার দরকার আছে। তবে সাধারণত আত্মহননের পেছনে মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। কারো জিনের মধ্যে হতাশা বা মানসিক অস্থিরতার বিষয়টি থাকতে পারে।অর্থাৎ জিনগত ভাবে ঝিনাইদহ এলাকার লোকেদের সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিসওর্ডার, মাইল্ড অটিসম, হাইপারটেনশন ধরনের মানসিক অসুখের মাত্রা বেশি থাকতেও পারে। এক্ষেত্রে মাদকের ব্যবহার (গাঁজা, ইয়াবা, হিরোইন, ফেনসিডিল প্রভৃতি) মানসিক অবসাদ বা অস্থিরতা সৃষ্টি করে আত্মহত্যার প্রবণতা প্রচন্ডভাবে বাড়িয়ে দেয়।
৬. এছাড়া একজন মানুষের বেড়ে ওঠার সময় তার পরিবারে বা চারপাশে আত্মহত্যার উদাহরণ থাকা- অত্যন্ত নেতিবাচক। কারণ আশেপাশে সর্বদা আত্মহত্যার ঘটনা দেখতে দেখতে বিষয়টি একটি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হতেই পারে। অনেকটা তড়িৎ চৌম্বকীয় আবেশের মত আশে পাশে নিয়মিত আত্মহত্যার ঘটনা নতুন আত্মহত্যার জন্ম দিতে পারে।
প্রতিকার:
১. আত্মহত্যা ঠেকাতে ঝিনাইদহে জনপ্রতিনিধি, জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ সহ সকল সরকারি সংস্থা মিলে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য সর্বদাই কাজ করে যাচ্ছে। স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় মাদক ও আত্মহত্যা বিরোধী সচেতনতা মূলক সভার আয়োজন করা হচ্ছে। সোসাইটি ফর ভলান্টারি অ্যাকটিভিটিজ (সোভা) এর মতো স্বেচ্ছাসেবী ও বেসরকারি সংস্থা আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া মসজিদ, মন্দির, গির্জার বয়ানেও ইমাম, পুরোহিত ও পাদ্রীগণ আত্মহত্যা মহাপাপ ও ধর্মীয়ভাবে আত্মহত্যার চরম নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সতর্ক করে যাচ্ছেন।
২. পরিবারে বাবা-মা অথবা বড়দের এ বিষয়ে প্রধান ভূমিকা নিতে হবে। সন্তানকে চাপ মোকাবেলা করতে শেখাতে হবে; পড়াশুনায় ভালো করা নিয়ে সন্তানের ওপর চাপ প্রয়োগ করা যাবে না। সাকিব আল হাসানকে ক্রিকেট বাদ দিয়ে শুধুমাত্র পড়াশুনা করার জন্য যদি চাপ প্রয়োগ করা হত তাহলে বিশ্বসেরা ক্রিকেটার আমরা কি করে পেতাম? সন্তানদের খেলাধুলা করা, মাদক থেকে দূরে রাখা এবং সামাজিক মেলামেশা করার সুযোগ বাড়িয়ে দিতে হবে। আত্মীয়, বন্ধু এবং আশেপাশের পরিবারসমূহকেও এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে।
৩. সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়েই মানব জীবন। ব্যর্থতা মেনে নেয়া নিজেরাও শিখতে হবে, বাচ্চাকেও শেখাতে হবে। ব্যর্থতা জীবনের অংশ এটা বুঝতে হবে। সন্তানদের তিরস্কার করা বা তাদের মর্যাদাহানিকর কিছু না বলা, মনে আঘাত দিয়ে বা সবসময় সমালোচনা না করা, সমবয়সী অন্যদের সঙ্গে তুলনা না করা-এগুলো অভিভাবকদের মেনে চলতে হবে।
৪. আত্মহত্যা প্রবণতা একটি মানসিক ব্যাধি। ঝিনাইদহের আত্মহত্যার অতি উচ্চহার বিবেচনায় নিয়ে এই জেলায় একটি সরকারি মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। এই মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে সাইক্রিয়াটিস্টের মাধ্যমে আধুনিক মানসিক চিকিৎসা ব্যবস্থা, মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন, কাউন্সিলিং এর সুযোগ থাকলে আত্মহত্যার হার ইতিবাচক ভাবে কমেও যেতে পারে।
আত্মহত্যা একটি সামাজিক ও মানসিক ব্যাধি। যেকোনো জীবন অত্যন্ত সম্ভবনাময় ও দেশের সম্পদ। কাজেই আত্মহত্যা ঝিনাইদহ জেলা থেকে দূর করতে হলে জনপ্রতিনিধি- প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি একটি সামগ্রিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে আত্মহত্যার এই ভয়ংকর প্রবণতা দূর করা সম্ভব।
মীর আবিদুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ঝিনাইদহ সদর সার্কেল।