দেশজুড়ে অপহরণের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং তা যেন প্রতিদিনকার আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে (জানুয়ারি–অক্টোবর) দেশজুড়ে ৯২১টি অপহরণের মামলা রেকর্ড হয়েছে—অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে তিনজনের বেশি মানুষ অপহরণের শিকার হয়েছেন। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৫০১, যা অপহরণের হার প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধির নির্দেশ দেয়। ক্রমবর্ধমান এ অপরাধ প্রবণতা জননিরাপত্তার ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, শুধু অক্টোবর মাসেই দেশজুড়ে ১১০ জন অপহৃত হয়েছেন—যা এ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। মার্চ, এপ্রিল, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে অপহরণের সংখ্যা একইভাবে উচ্চ ছিল। বিশ্লেষকেরা বলছেন, সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ডিজিটাল যোগাযোগের অপব্যবহার এবং অর্থনৈতিক চাপ এই বৃদ্ধির কারণ হিসেবে কাজ করছে।
আগে রাতের অন্ধকার বা নির্জন এলাকা অপহরণের প্রধান ক্ষেত্র হলেও এখন রাইডশেয়ারিং, অনলাইন বাণিজ্যিক লেনদেন, প্রেমের সম্পর্ক বা পরিচয়ের ফাঁদ ব্যবহার করে দিনের আলোতেও অপহরণ ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হিসাব অনুযায়ী, মুক্তিপণ আদায়ই অধিকাংশ অপহরণের কারণ। পাশাপাশি প্রতিশোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব বা পারিবারিক শত্রুতাও অনেক ঘটনায় প্রভাব ফেলছে। এমনকি প্রতিবেশী বা পরিচিতজনের সম্পৃক্ততার ঘটনাও কম নয়।
সামাজিক প্রেক্ষাপটে এ প্রবণতা বিশেষ উদ্বেগের। বিশেষ করে স্কুল–কলেজগামী শিশু ও তরুণদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রতিদিন তিনজন অপহৃত হওয়ার পরিসংখ্যান দেশের আইনের শাসনের প্রতি বড় ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি করছে।
অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “অপহরণের প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে; মুক্তিপণ আদায় ছাড়াও সামাজিক প্রতিশোধ, প্রেমঘটিত বিরোধ এবং ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবহারের মাধ্যমে অপহরণ বাড়ছে।”
পুলিশের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, প্রতিটি অপহরণ মামলাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক অপহরণচক্র ধরা পড়েছে। তিনি অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন এবং যেকোনো সন্দেহজনক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ৯৯৯ নম্বরে জানানোর আহ্বান জানান।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা অপহরণের নির্মমতা আরও স্পষ্ট করেছে—যেমন রাজধানীর দিয়াবাড়ী থেকে ক্যামব্রিয়ান কলেজের শিক্ষার্থী সুদীপ্ত রায়ের মরদেহ উদ্ধার, নওগাঁর ব্যবসায়ী অপহরণ, যাত্রাবাড়ীর ব্যবসায়ী মকবুলকে মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন, কিংবা টেকনাফে কলেজছাত্র হাসান শরীফ অপহরণ। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, অপহরণের ভয়াবহতা এখন দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।
বর্ধমান এ প্রবণতা রোধে বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অভিমত—আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ, প্রযুক্তিগত নজরদারি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।
সূত্র: কালের কন্ঠ।