সম্পাদকীয় : আজ ১৬ ডিসেম্বর-মহান বিজয় দিবস। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার এই দিনে জাতি গর্বের সঙ্গে স্মরণ করে ১৯৭১-এর সেই ঐতিহাসিক বিজয়কে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—স্বাধীনতার এত বছর পরেও কি আমরা একটি কার্যকর গণতন্ত্র ও প্রকৃত বাক্স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পেরেছি? দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এর উত্তর এখনো হতাশাজনক।
মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। অথচ আজ সেই চেতনাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষমতাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্রমাগত দুর্বল করে দিয়েছে। সংসদ কার্যত বিতর্কের মঞ্চ নয়, বরং দলীয় আনুগত্য প্রদর্শনের যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।
বাক্স্বাধীনতা আজ সংবিধানের পাতায় থাকলেও বাস্তবে তা ভঙ্গুর। সাংবাদিক, লেখক, নাগরিক সমাজের কণ্ঠস্বর নিয়মিত চাপের মুখে পড়ছে। ভিন্নমত প্রকাশ করলেই মামলা, গ্রেপ্তার কিংবা সামাজিক ও প্রশাসনিক হয়রানির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক নেতারা সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখছেন—এ প্রবণতা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিচয় হতে পারে না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো—নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ভেঙে পড়া। নির্বাচন হওয়া মানেই গণতন্ত্র নয়; নির্বাচন হতে হবে অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার পালাবদলের পথ সংকুচিত হওয়ায় জনগণের ভোটাধিকার কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ছে। এর দায় এড়াতে পারে না কোনো রাজনৈতিক দলই।
রাজনৈতিক নেতারা প্রায়ই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলেন। কিন্তু সেই চেতনার বাস্তবায়ন কি কেবল স্মরণসভা ও শ্লোগানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে ভিন্নমতকে সম্মান করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা—যা আজও অধরা।
বিজয় দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা একটি চলমান দায়িত্ব। এটি শুধু পতাকা ও পুষ্পস্তবকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি আত্মসমালোচনায় প্রস্তুত না হয়, যদি জনগণের কণ্ঠরোধই শাসনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে স্বাধীনতার অর্থ ক্রমেই ফাঁপা হয়ে যাবে।
আজকের দিনে রাজনৈতিক নেতাদের কাছে জাতির প্রত্যাশা স্পষ্ট—ক্ষমতার মোহ নয়, গণতন্ত্রের চর্চা; ভয় নয়, মতের স্বাধীনতা; দমন নয়, সংলাপ।
মহান বিজয় দিবসে এই আত্মপ্রশ্নই হোক আমাদের অঙ্গীকার-স্বাধীনতার অর্থ কি আমরা সত্যিই রক্ষা করতে পেরেছি?