সম্পাদকীয় : আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এক অস্বস্তিকর ও জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠেয় এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত শুধু একটি দলের অনুপস্থিতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে জানিয়েছে, দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট জটিল পরিস্থিতিতে ভারতের মাটিতে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বরং ভারতের পরিবর্তে শ্রীলংকার যেকোন ভেন্যুতে তারা খেলতে ইচ্ছুক। ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা যে কোনো দেশের জন্যই অগ্রাধিকার—এ নিয়ে দ্বিমত থাকার সুযোগ নেই। বিসিবির এই অবস্থান আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে একটি শক্ত বার্তা দিয়েছে: খেলাধুলা রাজনীতির ঊর্ধ্বে হলেও খেলোয়াড়দের জীবন ও সম্মান তারও ঊর্ধ্বে।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) বাংলাদেশের এই আবেদনকে কর্ণপাত না করে বরং বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এখানেই শুরু হয় মূল বিতর্ক। আইসিসি কি কেবল আয়োজক দেশের সুবিধা ও সময়সূচির দোহাই দিয়ে একটি পূর্ণ সদস্য দেশের উদ্বেগকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারে? নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে গভীর তদন্ত ও কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত কি আইসিসির নিরপেক্ষ চরিত্রের সঙ্গে মানানসই?
পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড প্রকাশ্যে বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিষয়টিকে আরও আন্তর্জাতিক মাত্রা দিয়েছে। একটি পূর্ণ সদস্য দেশের পাশে আরেকটি দেশের দাঁড়ানো স্পষ্ট করে দেয়—এটি শুধু দ্বিপাক্ষিক নয়, বরং বৈশ্বিক ক্রিকেট প্রশাসনের ন্যায়সংগত ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন।
বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসর কোনো একক দেশের ইচ্ছা বা রাজনৈতিক আবহে পরিচালিত হওয়া উচিত নয়। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা, অংশগ্রহণকারী দেশের সম্মান এবং সমান সুযোগ—এই তিনটি স্তম্ভের ওপরই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দাঁড়িয়ে। আইসিসি যদি এই স্তম্ভগুলোর একটিকেও দুর্বল করে, তবে ভবিষ্যতে আরও দেশ এমন অনাস্থার পথে হাঁটতে পারে।
বাংলাদেশের অনুপস্থিতি নিঃসন্দেহে বিশ্বকাপকে প্রতিযোগিতার দিক থেকে কিছুটা হলেও ফাঁপা করে দেবে। তবে তার চেয়েও বড় ক্ষতি হবে যদি ক্রিকেটপ্রেমীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে আইসিসি নিরপেক্ষ নয়, বরং শক্তিশালী আয়োজকদের প্রভাবেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
এই মুহূর্তে আইসিসির দায়িত্ব ছিল একটি গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ ও সংলাপনির্ভর সমাধানে পৌঁছানো। তা না করে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া ক্রিকেটের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এখনো সময় আছে—আইসিসি যদি সত্যিই ক্রিকেটের বৈশ্বিক অভিভাবক হতে চায়, তবে তাকে প্রমাণ করতে হবে যে খেলাটি সবার, কেবল শক্তিশালীদের নয়।