ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া অ্যাডেলা ফ্লোরেসকে আটক করে দেশছাড়া করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী। এই নজিরবিহীন অভিযানের পর ভেনেজুয়েলা জরুরি অবস্থা জারি করেছে এবং বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে ভেনেজুয়েলার বাইরে নিয়ে গেছে। এদিকে ভেনেজুয়েলা সরকার এই পদক্ষেপকে ওয়াশিংটনের “চরম গুরুতর সামরিক আগ্রাসন” হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারাকাসের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সমন্বিত হামলার পর মাদুরো দম্পতিকে আটক করা হয়। ঘটনার পরপরই ভেনেজুয়েলার প্রতিবেশী দেশগুলো এবং প্রেসিডেন্ট মাদুরোর ঘনিষ্ঠ মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের কড়া নিন্দা জানায়।
ইরান:
তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার “কঠোর নিন্দা” জানিয়ে বলেছে, এটি ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রকাশ্য লঙ্ঘন।
কলম্বিয়া:
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো একে লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে সতর্ক করেন, এ ঘটনায় একটি বড় মানবিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে। তিনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বানের দাবি জানান।
কিউবা:
ভেনেজুয়েলার ঐতিহ্যবাহী মিত্র কিউবা এই অভিযানকে “সাহসী ভেনেজুয়েলান জনগণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ” বলে আখ্যা দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।
রাশিয়া:
রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে “সশস্ত্র আগ্রাসন” হিসেবে নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এর কোনো গ্রহণযোগ্য যুক্তি নেই এবং কূটনীতির ওপর আদর্শগত শত্রুতা প্রাধান্য পেয়েছে।
স্পেন:
স্পেন উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়ে জানিয়েছে, তারা গণতান্ত্রিক, আলোচনাভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য মধ্যস্থতায় প্রস্তুত।
জার্মানি ও ইতালি:
জার্মানি পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির কার্যালয় জানিয়েছে, কারাকাসে অবস্থানরত ইতালীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বেলজিয়াম:
বেলজিয়াম ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
ট্রিনিদাদ ও টোবাগো:
দেশটির প্রধানমন্ত্রী কমলা পার্সাদ-বিসেসর বলেন, “শনিবার, ৩ জানুয়ারি ২০২৬ সকালে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ভেতরে সামরিক অভিযান শুরু করেছে। এই অভিযানের কোনো অংশে ট্রিনিদাদ ও টোবাগো জড়িত নয়। ভেনেজুয়েলার জনগণের সঙ্গে আমাদের শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।”
ইন্দোনেশিয়া:
ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইয়ভন মিউয়েংকাং বলেন, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং সব পক্ষকে উত্তেজনা কমিয়ে সংলাপের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।
যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ব্রায়ান শ্যাটজ বলেন, ভেনেজুয়েলায় যুদ্ধে জড়ানোর মতো কোনো জাতীয় স্বার্থ যুক্তরাষ্ট্রের নেই। আরেক সিনেটর রুবেন গালেগো এই পদক্ষেপকে বেআইনি আখ্যা দিয়ে মন্তব্য করেন, এক বছরেরও কম সময়ে যুক্তরাষ্ট্র “বিশ্ব পুলিশ” থেকে “বিশ্বের বুলি”তে পরিণত হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার ঘনিষ্ঠ মিত্র বলিভিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসও যুক্তরাষ্ট্রের “বোমা হামলা” তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের দাবি, কারাকাসের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত প্রধান সামরিক স্থাপনা ফোর্ট তিউনার আশপাশে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ওই এলাকায় হামলার দৃশ্য দেখা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। প্রাথমিক তথ্যে আরও বলা হয়, জেনারালিসিমো ফ্রান্সিসকো দে মিরান্ডা বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলার সময় কারাকাসের আকাশে মার্কিন সিএইচ-৪৭ চিনুক হেলিকপ্টার উড়তে দেখা গেছে।
ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত বদলাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই অভিযান ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, আল-জাজিরা।