দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই ইসরায়েলপন্থী হিসেবে পরিচিত একাধিক নির্বাহী আদেশ বাতিল করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাৎক্ষণিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন নিউইয়র্ক সিটির নতুন মেয়র জোহরান মামদানি। তার এই সিদ্ধান্তকে নগর প্রশাসনের নীতিতে এক নজিরবিহীন পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
শপথ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মামদানি তার পূর্বসূরি সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামসের জারি করা একাধিক নির্দেশনা বাতিল করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল—ইহুদিবিদ্বেষের আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা হিসেবে নিউইয়র্ক সিটির ইন্টারন্যাশনাল হলোকাস্ট রিমেমব্রেন্স অ্যালায়েন্সের (আইএইচআরএ) সংজ্ঞা গ্রহণের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং ইসরায়েল বয়কটের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার ওপর থেকে সিটি কর্মকর্তাদের জন্য আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।
এই সিদ্ধান্তের পরপরই কড়া প্রতিক্রিয়া জানায় ইসরায়েল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করে, মেয়র হিসেবে প্রথম দিনেই জোহরান মামদানি তার “আসল চেহারা” দেখিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, এটি নেতৃত্বের পরিচয় নয়; বরং “ইহুদিবিদ্বেষের আগুনে ঘি ঢালার” শামিল।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামস ২০২৪ সালে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার পর বেশ কয়েকটি বিতর্কিত নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। মামদানি দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেগুলোর অনেকটাই বাতিল করেন। আইএইচআরএ সংজ্ঞা গ্রহণের আদেশটি ছিল সবচেয়ে বিতর্কিত, কারণ সমালোচকদের মতে, এই সংজ্ঞায় ইসরায়েলের নীতির সমালোচনাকেও আধুনিক ইহুদিবিদ্বেষ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো।
মামদানি আরও বাতিল করেছেন সেই নির্দেশনাও, যার মাধ্যমে সিটি কর্মকর্তাদের ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা (বিডিএস) আন্দোলনের পক্ষে কাজ করা নিষিদ্ধ ছিল। পাশাপাশি উপাসনালয়ের আশপাশে বিক্ষোভ সীমিত করার নির্দেশনাও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ইসরায়েলের তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে এসব সিদ্ধান্ত ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই।
তবে মেয়র মামদানির কার্যালয় জানিয়েছে, এসব পদক্ষেপ নগর প্রশাসনে একটি “পরিষ্কার বিচ্ছেদ” ও “নতুন শুরুর” অংশ। নিজেকে একজন ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট হিসেবে পরিচয় দেওয়া মামদানি দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে সরব। উদ্বোধনী ভাষণে তিনি নিউইয়র্কের ইহুদি সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করে বলেন, “নিউইয়র্ক ছাড়া আর কোথায় আমার মতো একজন মুসলিম বেগেল ও লক্স খেয়ে বড় হওয়ার সুযোগ পেত?”
একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, আগের প্রশাসনের আদেশ বাতিল করা হলেও ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় তার প্রশাসন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। তিনি জানান, ‘অফিস টু কমব্যাট অ্যান্টিসেমিটিজম’ আগের মতোই সক্রিয় থাকবে। মামদানির ভাষায়, “ইহুদিবিদ্বেষ একটি গুরুতর সমস্যা, এবং আমরা এটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখি।”
উল্লেখ্য, জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মেয়র। তিনি আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ার ও প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাহমুদ মামদানির সন্তান। শপথ গ্রহণের সময় তিনি পবিত্র কোরআনে হাত রেখে শপথ নেন, যা পাঠ করান প্রবীণ ইহুদি নেতা ও যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স।
সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, পলিটিকো, টাইমস অব ইসরায়েল।